যে কোন মুল্যে বঙ্গবন্ধুর ছয় খুনির বিচার কার্যকর করতে হবে
মুন্সী বশীর- সভাপতি - কুইবেক আওয়ামীলীগ, কানাডা , রবিবার, অক্টোবর ০৭, ২০১২


১৫ই আগষ্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অশুভ দিন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুতে এ দিনটি সমগ্র জাতির জন্য কলঙ্কযুক্ত দিন। পঁচাত্তরের এ দিনে দেশবাসী একজন বদান্য নেতাকে হারালেও বাংলার ইতিহাসের পাতা থেকে উক্ত নেতা ও বিষাদময় দিন কখনো বিস্মরণ হবে না।
পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্ট বিশ্বাস ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর সম্ভাবিত সোঁনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে ভেঙ্গে খান- খান করে দিয়ে বাংলাদেশকে একটি অস্থিতিশীল রাজ্যে পরিণত করে। শুধু বঙ্গবন্ধুই নয়, ফন্দিবাজ ঘাতকরা তার পরিবারের আরো ৯ জন ব্যক্তিকে একই সঙ্গে পশুর ন্যায় নৃশংসভাবে হত্যা করেন। ক্ষমতার রাজনীতি ও স্বার্থপর ব্যক্তিদের বাধা প্রদানের সামর্থ্যের মুখে দীর্ঘকাল বঙ্গবন্ধুর পরিজন সংগত বিচার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। হত্যাযজ্ঞের সাথে জড়িত থাকা ঘাতকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা মোটেও সম্ভব হয়নি। তার প্রধান কারণ হত্যাকারীদের দোসর রাষ্ট্রক্ষমতার তৎকালীন সর্বশ্রেষ্ঠ নায়ক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের সৃষ্টি করা "ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ" অর্থাৎ দায়মুক্তি অধ্যাদেশ নামে উক্ত কৃষ্ণাবর্ণ আইন বঙ্গবন্ধু হত্যা, মামলার সমাধি দিয়েছিল।
ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নামে কালো আইনের প্রভাবে সুদীর্ঘ ২১ বৎসর বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি মুজিব হত্যার ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা। শ্যামবর্ণ আইন ও সামরিক সরকারের প্রভাবে একজন সন্তানের পক্ষে সম্ভব হয়নি মা-ভাই, বৌ ও পিতৃঘাতকদের বিচার প্রার্থনা করা। আর এভাবে অতিবাহিত হল একুশটি বছর। জিয়াউর রহমানের তৈরী করা কালো আইনে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদতে থাকে। বিচারের লক্ষ্যে কেউই স্পষ্টভাবে মুখ খোলার নির্ভয়তা পাননি, বন্দুকের নল সকলের মুখ রুদ্ধ করে দিয়েছিল। একটি পরিবারের এতগুলো ব্যক্তিকে পশুপক্ষীর মতো নির্মমভাবে হত্যা করার পর হত্যাকারীদের বিচার করা যাবে না, এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কি হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি মেজর জিয়ার এহেন অসংস্কৃত আচরণ ও আমানবিক পরিহাস অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে স্পষ্ট অনুভব করা যাচ্ছে এবং জনগণের নিকট পরিস্কার হয়ে গেছে যে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের সাথে জিয়াউর রহমান জড়িত ছিলেন।
পরিশেষে ছিয়ানব্বই সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমানের সৃষ্টি করা কালো আইন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করেন এবং উক্ত কালো আইন সংশোধনের পর ১৯৯৬ সালের ২রা অক্টোবর সর্বমোট তেইশ জনকে আসামী করে ঢাকা ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। উক্ত মামলার শুনানী অনুষ্ঠিত হয় ৮ই নভেম্বর ১৯৯৮ সালে অর্থাৎ মামলা করার দীর্ঘ দু'বৎসর পর ঢাকা জেলার দায়রা জজ জনাব গোলাম রসুল ২৩ জুন আসামীর মধ্যে ১৫ জনকে দোষী সাব্যস্ত্ম করে তাদেরকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে রায় প্রদান করেন। মৃত্যুদন্ড প্রদান করা উক্ত ১৫ জন আসামীর মধ্যে পুলিশ মাত্র চার জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন। বাকী ১১জন আসামী অর্থাৎ খুনী বিচারের হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের লক্ষ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে পালিয়ে যান।
ঢাকা হইকোর্ট ২০০১ সালে ১৫ জন দন্ডাধীন আসামীর মধ্যে ১২ জনের মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত করেন। বাকী তিনজনকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। গ্রেফতারকৃত আসামীরা ঢাকা সুপ্রিম কোর্টে লিভ টু আপীল দায়ের করলে মামলাটি দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হয়। বিএনপি- জামায়াতের হাপড়ে হাওয়া যন্ত্রে মামলাটির আপিলের শুনানিতে বিব্রতবোধ করেন। ২০০১ সালের ১৬ই আগষ্ট গ্রেফতারকৃত শুনানী অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর থেকে বহুবার মামলা পিছনোর পর এক পর্যায়ে আপিল বিভাগের কার্যতালিকা থেকে নিলম্বন করে দেন। তারপর থেকে মামলাটির ওপর বিএনপি-জামায়াতের চরম গতিরোধের সৃষ্টিতে মামলার চলনশক্তি কমে যায় এবং অবশেষে আপিল বিভাগের দুজন বিচারক আপিলের শুনানীতে পুনরায় বিব্রতবোধ করলে সুদীর্ঘকাল মামলাটি অচলয়িতব্য হয়ে পড়ে।
ফখরুদ্দিন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধুর মামলার শুনানির পুনরাবৃত্তির উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং তার অল্পকিছু দিনের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামী মহিউদ্দিন আহম্মেদকে (লেন্সার) বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। মহিউদ্দিন আহম্মেদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে অবতারণের পর অবিলম্বে হাইকোর্টের প্রাপ্ত রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি তোফাজ্জল ইসলাম, জয়নাল আবেদীন, মোঃ হাসান আমীনের আপিল বিভাগের বিশেষ বেঞ্চে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীদের দায়ের করা লিভ টু আপিলে শুনানি শুরু করার অতীব অল্পদিনের মধ্যে বিচারপতি হাসান আমীন অবসর গ্রহণ করেন। যার ফলে মামলাটি আরো কিছুদিন পশ্চাত গমন করেন। মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আপিল বিভাগের বিচারপতিদের শূন্যস্থান গুলো পূরণ করে ৭ জন থেকে ১১ জনে উন্নীত করেন। বিচার পতিগণ অকর্তব্যকে পরিত্যাগ করে নিরতিশয় সন্তোষ জনক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করেন। বহুদিন কালাতি বাহনের পর অবশেষে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আদেশ পেয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের সুবিচার কিছুটা হলেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু খুনীর সংখ্যা ১২ জনের মধ্যে ৫ জনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। আর বাকী ৭ জনের মধ্যে জিম্বাবুয়েতে পলাতকবস্থায় লে. কর্ণেল (অবঃ) আজিজ পাশা মারা গেছেন। উদবৃত্ত ছয়জন খুনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখনো জীবন্তবস্থায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা হচ্ছেন ১) লে, কর্ণেল (অব) খন্দকার আব্দুর রশিদ, ২) মেজর (অব) এ, এম, রাশেদ চৌধুরী, ৩) মেজর (অব) এস, এইচ, এম বি নূর চৌধুরী ৪) মেজর (অব) শরিফুল হক ডালিম, ৫) রিসালাদর মোসলেম উদ্দীন, ৬) ক্যাপ্টেন (অব) আব্দুল মাজেদ। যাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছে তারা হচ্ছেন, ১) লে. কর্ণেল (অব) সৈয়দ ফারুক রহমান, ২) কর্ণেল (অব) সুলতান মিঞা রিয়ার রশিদ খান, ৩) লে. কর্ণেল (অব) মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আটিলারী) ৪) মেজর (অব) বজলুল হুদা, ৫) মেজর (অব) এ.কে.এম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার)। বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর অবশিষ্ট খুনীরা যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আত্ন গোপন করে আছেন তাদেরকে শীঘ্র বাংলাদেশে প্রত্যাগত করানো উচিৎ। একটি পরিবারের এতগুলো ব্যক্তিকে পশু পাখীর মতো হত্যা করে যে ধরনের অন্যায় ও পাপ করেছে তার সমকক্ষ প্রায়াশ্চিত্ত ভোগ করা উচিৎ নতুবা উক্ত ঘাতকদের অনুসরণ করে পর্যায়ক্রম ঘাতক সৃষ্টি হবে। বঙ্গবন্ধু অবশিষ্ট খুনিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে অতীব আয়াসসাধ্য হওয়া উচিত। সাজাপ্রাপ্ত খুনিরা বর্তমানে যে সমস্ত রাষ্টে আশ্রয় গ্রহণ করেছে তাদের প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজন অপেক্ষা অধিক গুরুত্ব দেয়া কর্তব্য। এ ক্ষেত্রে সরকারের ভুয়িষ্ট কার্যসিদ্ধির জন্য চেষ্টা করা দরকার এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘ সহ বিশ্ব নেতাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে তাদেরকে বেষ্টিত করা প্রয়োজন। যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে পলাতক উক্ত উদবৃত্ত খুনীদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে নিয়ে বিচার ফলকার্যকর না করা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বিচার পরিসমাপ্তি হবে না।