একটি অবিস্মরনীয় সদিচ্ছা মন্ত্রঃ “যুগ যুগ জিও তুমি-মওলানা ভাসানী”
নূর মোহাম্মদ কাজী , বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৫, ২০১২


মহান জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীর জীবদ্দশায় তাঁর সামনে আমরা শ্লোগান দিয়েছি, “যুগ যুগ জিও তুমি-মওলানা ভাসানী”। ১৯৬৮ সালের ৬ই ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের জনসভায় আমরা যখন প্রথম তাঁর সামনে এ স্লোগান দেই, তখন তাঁর বয়স প্রায় ৯০ বছর। এ সময় বাঙালি জাতির উপর যে নিপীড়ন চলছিল তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার মত কোন নেতা ছিলেন না। শেখ মুজিবুর রহমান তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় রায় প্রাপ্ত ফাঁসীর আসামী। মওলানা ভাসানী বার্ধক্যের জ্বরাকে উপেক্ষা করে জাতিকে আবার সংগ্রামের মশাল হাতে নিলেন। আমরা নব আশায় প্রজ্জ্বলিত হলাম। আমাদের তরুন কণ্ঠ সোচ্চারিত হলো। সেদিন পল্টন ময়দানের বিশাল জনসভায় আমাদের যত শক্তি ছিল তা দিয়ে এ সদিচ্ছা–মন্ত্র (Wishing words) উচ্চারন করেছিলাম।

মওলানা ভাসানী বার্ধক্যের জ্বরা-ব্যাধিকে উপেক্ষা করে ১৯৬৯ সালে সংগঠিত করেছিলেন গনঅভ্যুত্থান। ফাঁসির রজ্জু থেকে মুক্ত করে এনেছিলেন তার প্রিয় অনুসারী শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১৯৭১ সালে মুাক্তি যুদ্ধে তাঁর দূরদর্শী গাইডেন্সে আমরা অর্জন করেছি বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর পরই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এখানেই মুক্তি সংগ্রামের শেষ নয়, শুরু। তিনি আগ্রাসন প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুললেন। ১৯৭৫ সালের মধ্য আগষ্টের পর দেশ এক ভয়াবহ অবস্থায় পতিত হলো। সীমান্তে শুরু হলো হামলা। নেতাহীন দেশ। সেনাবাহিনী বিশৃংখল। ১৯৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর ঢাকার রাজপথে সিপাহী জনতা এক হয়ে শ্লোগান দিল “যুগ যুগ জিও তুমি- মওলানা ভাসানী”। সীমান্ত হামলা কে প্রতিরোধ করবে? রোগে জ্বরা-জীর্ণ মওলানা ভাসানীর কাছে ছুটে গেলেন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। অসুস্থ মওলানা ভাসানী তখন ঢাকার পি জি হাস্পাতালে। জিয়াউর রহমান বললেন, “হুজুর আপনি ছাড়া আমাদের আর কেহ মুরুব্বী নাই। কাদেরিয়া বাহিনী সীমান্ত হামলা চালাচ্ছে। আপনি না গেলে কাদের সিদ্দিকী অঘটন ঘটাবে। বহিরাগত আক্রমন আমরা ঠেকাতে পারবো না। আমরা শেষ হয়ে যাব। বাংলাদেশ শেষ হয়ে যাবে”। ডাক্তারদের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মওলানা ভাসানী সীমান্তে গেলেন। আসাম সীমান্তে হাজার হাজার মুরিদ পীর ভাসানীকে দেখার জন্য ছুটে এলো। সীমান্তে শ্লোগান উঠলো “যুগ যুগ জিও তুমি-মওলানা ভাসানী”। সীমান্ত হামলাকারী বহি র্শক্তি থমকে দাঁড়ালো। তবে ভিতরে বাহিরে আক্রমনের সম্ভাবনা রয়েই গেল।

এরই মধ্যে ১৯৭৬ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে ভারত ফারাক্কা ব্যারাজে গংগা নদীর পানি এক তরফা প্রত্যাহার করে নিল। পদ্মা শুকিয়ে গেল। হাহাকার পড়ে গেল বাংলাদেশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুপুর বেলা পি জি হাস্পাতালে জাতীয় ছাত্র দলের কয়েকজন তরুন কর্মীসহ আমি ছুটে গেলাম মুমুর্ষ মওলানা ভাসানীর কাছে। বললাম, ‘হুজুর কিছু একটা করতে হবে, আমাদের দেশ মরুভূমি হয়ে গেছে”। তিনি জ্বরে ভোগছিলেন। আমাদের উত্তেজনা দেখে তিনি শোয়া থেকে উঠে বসলেন। অনেকক্ষন আমাদের সাথে কথা বললেন। কি প্রবল আশা নিয়ে আমরা তার কাছে গিয়েছি তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। বলেছিলেন, “তোমাদের মত যুব শক্তি কি না করতে পারে। মনে রেখ বাংলাদেশকে কেঊ কুক্ষিগত করে রাখতে পারবে না। বিদায় নেবার সময় হুজুর আমাকে সন্ধার দিকে দেখা করার কথা বললেন। সন্ধার দিকে শহরের নানাস্তরের লোক পিজি হাস্পাতালে হুজুরকে দেখতে আসতেন। তবে আমার ডিঊটি ছিল প্রতিদিনের। হুজুর চাইতেন আমি প্রতিদিন তার সাথে দেখা করি। সাতটা বাজার আগে আমাদের সকলকে বললেন তোমরা এখন চলে যাও। আর আমাকে বললেন পরদি সকালে তার সাথে দেখা করতে। পি জি হাস্পাতালের গেটে এলে পরে দেখলাম সেনা প্রধান জিয়াউর রহমান এসেছেন মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করতে। পরদিন সকালে গিয়ে দেখি হুজুর খুশি মুডে আছেন। বললেন- সিরাজকে (সিরাজুল হসেন খান) ডেকেছি। সে এখনই আসবে। মশিউর (মশিউর রহমান যাদু মিয়া) কাল রাত এসেছিল। আমরা গংগা নদীর পানির ন্যার্য হিসসার দাবীতে লং মার্চ করবো। সেদিন ফারাক্কা লং মার্চ করার ঘোষনা দিয়ে তিনি যে পরিচালনা কমিটি প্রস্তাব করলেন তাতে জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের সাথে আমার নাম রাখতে তিনি ভুলেন নাই। ১৯৭৬ সালের ১৬ই মে মওলানা ভাসানী রাজশাহী মাদ্রাসা ময়দান থেকে লক্ষাধিক মানুষের মিছিল নিয়ে ফারাক্কা অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিলেন। আমি তাঁর সাথে সাথে দীর্ঘ পথ দৌড়িয়ে অতিক্রম করেছিলাম। আর শ্লোগান দিচ্ছিলাম, “যুগ যুগ জিও তুমি- মওলানা ভাসানী”। আমাদের মনে এই ধারনা হয়েছিল যে, সংগ্রাম তো শেষ হয়নি। আমাদের আরো অনেক পথ যেতে হবে। সংগ্রামকে অব্যাহত রাখার জন্য হুজুর আরো অনেকদিন বেঁচে থাকবেন। পার্টির সাধারন সম্পাদক মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ছোট একটা গাড়ীতে হুজুর উঠেছিলেন। রওয়ানা হবার পুর্ব মুহুর্তে তার ডায়াবেটিস বেড়ে ১৭/১৮ তে উঠানামা করছিল। ব্রংকাইটিস বেড়ে গিয়েছিল। হুজুর খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। আমি কাছে থেকে তার কষ্ট দেখেছিলাম বিধায় আজ আমার সে স্মৃতি মনে পড়লে কষ্ট হয়। হজুরের জন্য কষ্ট অনুভব করি। ফারাক্কা লং মার্চের পর আর মাত্র পাঁচ মাস হুজুর বেঁচে ছিলেন। তিনি হজ্জ্বে যাবার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল হাস্পাতালে চেক-আপ ক রাতে এসে ইন্তেকাল করবেন। ১৯৭৬সালের ১৭ই নভেম্বর দুপুর ১২ টা পর্যন্ত আমরা তাঁর সাথে কথা বলেছি। ১৯শে নভেম্বর তিনি হজ্জে যাবেন। আর দুপুরের খাবারের পরই দিবা ঘুমেই তিনি ইন্তেকাল করলেন! তাঁর এ আকস্মিক মৃত্য আমি আজ ও মেনে নিতে পারি নাই। আমার এ ধারনার কারন এও হতে পারে যে, “যুগ যু গ জিও তুমি মওলানা ভাসানী”-এ শ্লোগান আমি এত বেশীবার উচ্চারন করেছি, যা আমার মানস-স্বত্তায় এক বিশ্বাসের ভিত নির্মান করেছে যে, মওলানা ভাসানী এত তাড়াতাড়ি মরতে পারে না। তিনি অমর।

মহান নেতা মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর দেশে নানা অনাকাংখিত রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। এ সঃ ব প রই ব র্ত নের সাথে আমি নিজেকে আর খাপ খাওয়াতে পারলাম না। আমার মনে নানা দুঃখ ও বেদনাবোধ দানা বেঁধে উঠলো। এ দুঃখ ও বেদনাবোধ নিয়ে আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে এ নভেম্বর মাসেই আমি বাংলাদেশ ত্যাগ করি। এবং প্রথমে কিছু দিন আমেরিকায় ও পরে কানাডার কুইবেকে এসে বসবাস শুরু করি। এ দেশে এসে প্রথমেই আমি ১১ই নভেম্বর “স্মরনীয় দিন-আমরা ভুলি নাই” (Remembrance Day-Lest we forget) পাই। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে নিহত কানাডার ২৫ হাজার সৈন্যের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত এদিন। এ দেশে এসেই আেমি একটি বিষয় গভীরভাবে লক্ষ্য করলাম যে, কানাডার সরকার ও জনগন এদেশে অতীতে ঘটে যাওয়া জাতীয় ঘটনা ও এ ঘটনার নায়ক জাতীয় নেতাদের ইমেজ নানা ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এবং এর দ্বারা তারা তাদের নুতন প্রজন্মের জন্য সামাজিক ঐক্য নির্মানের লক্ষ্যে সামজিক স্মৃতি-ভান্ডার পরিপুর্ন করছেন। উল্লেখ্য, এ দেশে জনসংখ্যার চাইতে গাড়ীর সংখা বেশী। লক্ষ্যনীয় যে, কুইবেক প্রদেশের প্রতিটি গাড়ীর পেছনের নেইমপ্লেটে ফ্রেন্স ভাষায় লেখা রয়েছেঃ Je me souveins (আমি কি ভুলিতে পারি”)? এখানে ফ্রেন্স-কানাডিয়ানরা নিজদের ভাষার প্রাধান্য রক্ষার জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করছেন। এ ভাষা রক্ষার জন্য যারা সংগ্রাম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের স্মরনীয় করে রাখার জন্য সরকারীভাবে প্রতিটি গাড়ীর নেইমপ্লেটে মন্ত্র (Motto) লিখে দেয়া হয়। এ দেখে আমাদের মনে গৌরববোধ জন্মে। আমরাও তো গত ৬০ বছর ধরে এ ধরনের মন্ত্র উচ্চারণ করে আসছি। আমরা গেয়ে আসছি “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙাগানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি”?

এখানে আমার লিভিং রুমে মওলানা ভাসানীর একটি বড় ছবি টাংগানো রয়েছে। আমার ছেলে আমাকে প্রশ্ন ক রেছে, বাবা তুমি মও লানা ভাসানীর ছবি কেন এত দূর দেশে এসেও তুমি রক্ষা করছো? এ নেতা তোমার বা আমার জীবনে কি কোন উপকারে এসেছে? আমি তার এ প্রশ্নের উত্তর আজো দিতে পারি নাই। পুর্বপুরুষদের স্মৃতি কি ভাবে আমাদের মানস জগত নির্মান করে। জাতীয় ঐক্য গ্রোথিত করে তা আজো আমরা বুঝতে সক্ষম হই নাই। পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী জাতি পুর্বপুরুষ পুঁজায় (Ancestor worship) বিস্বাসী। এরা পুর্বপুরুষদের স্মরণ করার মাধ্যমে প্রথমে নিজ জাতির সামাজিক মনোভূমি (Social imaginary) নির্মাণ করেছে। এ ভিত্তির উপর তারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। এবং স্বজাতির ঐক্যের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে বিন-জাতিকে করতল গত করেছে। পুর্বপুরুষ পূজার নিদর্শন হিসেবে রাজতন্ত্র রক্ষা করছে। আরব জাতি এ ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভুমিকা পালন করেছে। আরবী ভাষা ও আরব জাতির সামাজিক মনোভূমি অন্যের জন্যও তারা প্রয়োজনীয় করে তুলেছে।

বাঙালি কৌমকে ঐক্যবদ্ধ্ব করার ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানীর চাইতে বড় ভুমিকা আর কেহ পালন করেন নাই। মওলানা ভাসানী আজ আর আমাদের মাঝে নেই। আজ থেকে ৩৬ বছর আগে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। জাতি কি তাকে ভুলে গেছে? না, জাতি তাকে ভুলে যেতে পারে না। তিনি আমাদের মাঝে আছেন। তিনি জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াইয়ে আছেন। তিনি অসাম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের লড়াইয়ে আছেন। তিনি ক্ষমতাসীনদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষমতাহীন নিপীড়িত মানুষদের সাথে আছেন। তিনি সকল সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, সম্প্রসারনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের পথের দিশারী হয়ে আছেন। তিনি সকল প্রকার শোষন-বঞ্চনার বিরুদ্ধে গনমানুষের লড়াইয়ের মধ্যে আছেন। এবং তিনি আমাদের সদিচ্ছা-মন্ত্রঃ “যুগ যুগ জিও তুমি -মওলানা ভাসানী”র মধ্যে বেঁচে আছেন।

তবে আমাদের পুর্বপুরুষদের স্মৃতি ভুলিয়ে দেবার জন্য একদল লোক মাঠে নেমেছে। আমাদের সকল অর্জনকে এরা বিফল করে দিতে চায়। এরা নানা প্রকার পোষাক ও আলখেল্লা পড়ে মাঠে নেমেছে। সু্যোগ সুবিধার বিনিময়ে এরা ভিন-জাতির পুর্বপুরুষদের ইমেজ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেছে। এরা বড় চালাক লোক। এরা মনে করে ধর্মবাদ, মানবতাবাদ, মার্ক্সবাদ, গান্ধীবাদ ইত্যাদি মতবাদ হলো ক্ষমতা বলয় সৃষ্টির হাতিয়ার। দেশপ্রেম, জাতিপ্রেম, মানবপ্রেম এদের কাছে বোকাদের আপ্তবাক্য। নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামকে এরা ভয় পায়। মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর নাম শুনলে এদের আতংক বিমার বাড়ে। কারন মওলানা ভাসানী বেঁচে আছেন নিপীড়িত মানুষের সদিচ্ছা-মন্ত্রঃ “যুগ যুগ জিও তুমি- মওলানা ভাসানী” মধ্যে।