৭ই নভেম্বর বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা
ফয়সল আহমদ চৌধুরী , সোমবার, নভেম্বর ০৫, ২০১২


৭ই নভেম্বর বিপস্নব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। ঐ দিনটি জাতি হিসাবে স্বাধীনতার যুদ্ধের পরবর্তীতে আবারও ঐক্যবদ্ধ করেছিল। আমাদেরকে নতুন করে ঘুড়ে দাঁড়ানোর চেতনা ও সাহস যুগিয়েছিল। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে স্বাধীন জাতী হিসাবে পৃথিবীর বুকে অনন্তকাল স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অফুরন্ত উৎস ছিল ঐ দিনটি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একক নেতৃত্ব এর স্থান দখল করে নিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামীলীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। পাকিস্তানী বেনিয়া শাসন এর বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের মানুষের পাশে থেকে আপোষহীন দল হিসাবে আওয়ামীলীগকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তার নেতা জনাব শেখ মুজিবুর রহমান। সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতৃত্বে একটি বিশাল সংগ্রামী ছাত্র সংগঠন গড়ে উঠেছিল তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতাদের নেতৃত্বে। এরা স্বাধীকার সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রামে নিয়ে আসতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এ অঞ্চলের মানুষ গণরায় হিসাবে আওয়ামীলীগের পক্ষে রায় প্রদান করে। অধিকার বঞ্চিত মানুষেরা শতকরা ৯৫% ভাগ ভোট নৌকার পক্ষে প্রদান করে। অধিকার আদায়ের একক নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ ও তার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে নিরপেক্ষ ক্ষমতা প্রধান করে। এ গনরায়কে পাকিস্তানী বেনিয়া সম্মান না দেখিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে মহা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠে। জাতীয় নেতাদেরকেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানানোর মোহে আচ্ছন্ন রেখে ২৫শে মার্চ ১৯৭১ পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম হত্যযজ্ঞ চালায় পাক সেনাবাহিনী। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জাতীয় এ সংঙ্কটকালে কোন দিক নির্দেশনা না দিয়ে গ্রেফতার হলেন। অনেকেই গোপনে পালিয়ে গেলেন। সারা জাতি এক অন্ধকারে নিমজ্জিত হল। দিশাহারা হল সর্ব সাধারণ, কিংকর্তব্যবিমুঢ় হল সমগ্র দেশবাসী। আর ঠিক তখনই এগিয়ে এলেন বুকে প্রচন্ড সাহস নিয়ে এক অফিসার পাকিস্তানী বেরেক থেকে বেড়িয়ে এসে বর্বরতম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদ করলেন। বিদ্রোহ ঘোষণা দিলেন পাকিস্তানী নরঘাতকদের বিরুদ্ধে। সারা পৃথিবীর সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা দিলেন। বিশ্বকে জানালেন বাংলাদেশ আজ থেকে স্বাধীন। স্বাধীনকামী বিশ্ববাসী এই দেশের মুক্তি সংগ্রামে যেন সাহয্য করে। শুরু হল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, অন্ধকারে আচ্ছাদিত জাতি দেখতে পেল আলোর পথ। ফিরে পেল যুদ্ধের মনোবল। প্রতিবেশী দেশসহ সারা বিশ্ব এগিয়ে এল নিপীড়িত জাতিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। মূলত মেজর জিয়ার সেই বীরত্বপূর্ণ ভাষনেই দিশাহারা জাতিকে দিশার পথ দেখিয়েছিলেন।
নয় মাস যুদ্ধের পর লক্ষ জনতার রক্তের বিনিময় অর্জিত হল প্রিয়তম স্বাধীনতা। রাষ্ট্র ক্ষমতা গ্রহণ করলেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। গঠিত হল দলীয় সরকার। যে যুদ্ধে দল মত নির্বিশেষে সকলের অংশ গ্রহণের মাধ্যমে হয়েছিল জাতীয় যুদ্ধ সেই যুদ্ধকে পরবর্তী সরকার জাতীয় সরকারে না দিয়ে দলীয় সরকার গঠন করা হল। সমস্ত জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বিভক্তি সৃষ্টি করা হল। দলীয় সংঙ্কীর্ণতায় আবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে লাগল। স্বাধীন দেশের উপযোগী শাষন ব্যবস্থা না করে পাকিস্তানী কায়দায় শাষন ব্যবস্থা পরিচালনা করা হল। ফলে অচিরেই দেখা গেল লক্ষ প্রাণের বিনিময় অর্জিত প্রিয়তম স্বাধীন দেশ সর্ব ক্ষেত্রে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসাবে সারা পৃথিবীতে পরিচয় লাভ করল। সেই উপনিবেশিক জায়গায় স্বাধীনতার শুরু থেকেই বিরোধী দল মতকে জব্দ করার জন্য বিভিন্ন কলা কানুন তৈরি হল। ভিন্ন মত পোষন করার জন্য বিনা বিচারে সিরাজ সিকদার, শাহজাহান মাষ্টার, রুস্তম দীনেশ, হাদীসহ হাজার হাজার মুক্তিযোদ্দাকে হত্যা করা হল। প্রসাশন ব্যাবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে দলীয় করন করা হল। ৭৪ সালে কৃত্রিম দূর্ভিক্ষ কালে লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণ হারাল। সরকার সর্বক্ষেত্রে একের পর এক ব্যর্থতার নিমজ্জিত হল। বিরোধী দলের মিছিলে গুলি চালানো হল (৭৩ সালে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে, ৭৪ সালে জাসসের মিছলে) এত প্রাণ হারালো অনেকে। হত্যা, সন্ত্রাস, লুটপাট, রিলিফ চুরি, জবর দখল রাষ্ট্রময় নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়ালো। সর্বপরি তখনকার সরকার তার শাষন পাকাপোক্ত করার জন্য ১৯৭৫ সালের জানুয়ারী মাসে সংসদে ৪র্থ সংশোধনী বিল এনে একদলীয় শাষন ব্যবস্থা চালু করল। যার মাধ্যমে জনগণের মৌলিক অধিকার খর্ব করা হল। সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা চিনিয়ে নেওয়া হল অর্থাৎ সরকারী দল "বাকশাল ছাড়া বাংলাদেশে অন্য কোন রাজনৈতিক দল করার অধিকার আর কাহারও থাকল না।
এহেন পরিস্থিতিতে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রকারী সক্রিয় হযে ক্ষমতাশীল দলের কিছু নেতাদের সহায়তায় ও সেনাবাহিনীর কিছু সংখ্যক বিপদগামী অফিসারের যোগসাজশে ১৫ আগষ্টের নিষ্টুরতম হত্যাযজ্ঞ ঘটে। তৎকালীন রাষ্টপতি শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহন হন। ক্ষমতায় আসেন উনারই সহকর্মী প্রধান আওয়ামীলীগ নেতা খন্দকার মোস্তাক আহমেদ। আওয়ামীলীগ সংসদ সদস্যরাই এই হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়ার জন্য ইনডিমিট আইন পাশ করেন। জাতি অবাক হয়ে দেখল ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডে লাশ রেখে মুজিব কোট পরিধান করে আবারও মন্ত্রিত্ব শপথ গ্রহণ করতে। ১৫ আগষ্ট থেকে ৭ই নভেম্বর পর্যন্ত্ম মূলত ছিল ক্ষমতাশীনদের ক্ষমতার লড়াই। ৩রা নভেম্বর বিদেশী প্রভুদের সহায়তায় রাষ্ট্রে ক্ষমতা গ্রহণ করেন খালেদ মোশাররফ ; বন্দি করা হয় সেনা প্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। খালেদ নিজকে সেনা প্রধান হিসাবে ঘোষনা করেন। বিদেশী প্রভুদের সাথে আতাত করে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে চান। দেশকে নিয়ে চলে গভীর চক্রান্ত। ৩রা নভেম্বর থেকে ৭ই নভেম্বর দেশে সৃষ্টি হয় অচল অবস্থা। নৈরাজ্য আর হত্যযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে সর্ব ক্ষেত্রে বিরাজ করছিল এক মহাসংঙ্কট। এ দিকে কর্ণেল (অব:) তাহেরের নেতৃত্বে গণবাহিনী সক্রিয় অবস্থান নেয়। তাহাদের বিপস্নবী সৈনিক সংস্থা ঢাকা সেনানিবাসে ঐদিনগুলিতে অত্যন্ত তৎপর ছিল বলে জানা যায়। মূলত দেশে তখন কোন সরকারের একক কতৃত্ব ছিল না। স্বাধীনতা সর্বভৌমত্ব হয় বিপন্ন।
স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ সংকট কালে এগিয়ে এসে খালেদ মোশারফের সরকারের উপর বিদ্রোহ ঘোষনা করে। সিপাহি জনতার কাঁদে কাঁদ মিলিয়ে দেশ মাতৃকাকে বাঁচিয়ে রাখার শপত গ্রহণ করে। ঢাকা শহর কাঁপিয়ে দেয় সিপাহি জনতার জয় ধ্বনিতে। সিপাহিরা মুক্ত করে নিয়ে আসে মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে। মূলত ৭ই নভেম্বর সারা জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে শহিদ জিয়াকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়। এই দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ৭ ই নভেম্বর এর থেকে ক্রমান্নয়ে আমাদের শাষন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসে সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিল তখন বিরাট বিশৃঙ্খলা। বিশেষ করে কর্ণেল (অব) তাহেরের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ "বিপস্নবী সৈনিক সংস্থার সাথে জাড়িয়ে পড়েছিল যারা প্রচলিত সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে পিপলস আর্মী ধরনে সামরিক বাহিনী গঠন করতে চেয়েছিল। সেনা প্রধান জিয়া অত্যন্ত সাহসের সাথে সেনাবাহিনীকে রেজিমেন্টাল কমান্ডের মধ্যে নিয়ে এসে অল্প দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবানীকে একটি চৌকুশ বাহিনী হিসাবে গড়ে তুলে ছিলেন। পুলিশ সিভিল প্রশাসন সহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সুনিদৃষ্ট পরিচালনা করে দিয়েছিলেন, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একদলীয় স্বৈরশাষন থেকে মুক্ত করে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যাবস্থা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। মানুষের বাক স্বাধীনতা, সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক আচার আচরন পথ সুযোগ করা হয়েছিল ঐ ৭ই নভেম্বরের বিপস্নবও সংহতি দিবসের মধ্যে দিয়ে। বিশ্বে তলাহীন ঝুড়ির অপবাদ থেকে জাতিকে মুক্ত করে সম্মানের আরোহন করেছিলেন। ইসলামী বিশ্বের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল এ মহান বিপস্নব এর মধ্যে দিয়েই। শহিদ রাষ্ট্রপতি আমাদের পরিচয় বাংলাদেশী হিসেবে এই আধুনিক বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যার মাধ্যমে স্বাধীন দেশে মুনিপুরি, চকমা, নাগা, খাসিয়া সহ অনন্য ছোট জাতীগুলো স্বাধীনতা রেখে বাংলাদেশী হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাস করার নাগরিক অধিকার পেয়েছিল। কোন অবস্থাতে ৭ই নভেম্বরকে খাট করে দেখার সুযোগ নেই। মূলত ৭ই নভেম্বর এর চেতনাই মুক্তি যুদ্ধের চেতনা, যে চেতনা বুকে নিয়ে লক্ষ লোক শহিদ হয়েছিল। এই চেতনাই আমাদেরকে শিখাবে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে রাষ্ট্র বড়। যে রাষ্ট্রে শুধু মুসলিম, হিন্দু, বুদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা পাহাড়ী গারো, চাকমা, মনিপুরী হিসাবে অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান এর অধিকার দিবে না, দিবে বাংলাদেশী হিসাবে সম অধিকার।