বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাত্রা বৃদ্ধি করার জন ও বস্ত্র শিল্পকে অক্ষুন্ন রাখতে বাংলাদেশের শ্রম আইন সং
মুন্সী বশির, মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৯, ২০১৩


বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাত্রা বৃদ্ধি করার লক্ষে ও বস্ত্র শিল্পকে অক্ষুন্ন রাখতে বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধন করা যুক্তিযুক্ত বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্প ষোল কোটি মানুষের অতুলনীয় প্রকৃষ্ট ঐশ্বর্য। দেশটির রপ্তানীযোগ্য পণ্য-দ্রব্যের মধ্যে বস্ত্র শিল্প একটি অন্যতম প্রতিষ্ঠান। বস্ত্র রপ্তানীকারী দেশগুলোর মধ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় স্থানে রয়েছে। সুসংবাদে বাংলাদেশ গৌরবে উদ্ভাসিত। বাংলাদেশে নির্মিত বা উৎপন্ন পণ্যদ্রব্য সমগ্র বিশ্বসমাদৃত।

একদিকে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক বিদেশে রপ্তানী করে যেমন বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, অন্যদিকে বাংলাদেশের বস্ত্র শিল্প দেশের কর্মহীন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। বিদ্যমান অবস্থায় পৃথিবীর শ্রীবৃদ্ধিযুক্ত মহাদেশগুলো যেমন, আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের বহু রাষ্ট্র ইদানিং বাংলাদেশ থেকে নানা ধরণের বস্ত্র ও পণ্যদ্রব্য আমদানি করছে। এ সমস্ত দেশগুলোতে বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অত্যন্ত স্বল্প মূল্যে বাংলাদেশের নির্মিত পোশাক বিদেশী বড় বড় কোম্পানীগুলো অনায়াসে গ্রহণ করছে। সম্প্রতি বিশ্বের সর্বোৎকৃষ্ট মার্কেটগুলোতে বাংলাদেশের তৈরী বস্ত্র ঈষৎ মূল্যে তা ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। বস্ত্র ছাড়াও বাংলাদেশের নির্মিত রকমারী প্রাত্যহিক ব্যবহারের পণ্য-দ্রব্য ব্যবহার করে প্রবাসে এর চাহিদা আরো আরো ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক সহায়তা হবে এবং দেশের সহায়হীন ব্যক্তিদের অবলম্বন সাধিত হবে। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক বিদেশে রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ২৫০ কোটি ডলার প্রায় (দশ হাজার কোটি বাংলাদেশ টাকা) বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় কুড়ি হাজার কোটিতে অবস্থান করছে। অর্থাৎ দুই গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের এক বৃহত্তম সূত্রে পরিণত হয়েছে এবং দেশের পোশাক শিল্পে অসংখ্য দরিদ্র নারী-পুরম্নষ চাকুরী করে স্বাবলম্বী হচ্ছে। বস্ত্র শিল্পে চাকুরী না পেলে এদের অনেকেই হয়তো অন্য কারো বাসায় চাকরানী বা প্রহরীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। আর এ সুযোগটি নিচ্ছেন পোশাক শিল্পের মালিকরা। স্বল্প বেতনে প্রতিষ্ঠানের মালিকরা তাদেরকে ব্যবহার করছেন। শুধু তাই নয় জেলখানার কয়েদীদের মতো কোনো কোনো বস্ত্র শিল্পের মালিকরা তাদেরকে তালাবদ্ধ করে ক্রমাগত অশোভন আচরণ করছেন।
দেশের নিঃসহায় নারী-পুরুষরা ঘোর অনটনের মাধ্যমে যাদের সংসার চলে, ক্ষুধার তাড়নায় পেটের খোরাক যোগার করার লক্ষ্যে বস্ত্র শিল্পের মালিকরা অন্যায় আচরণ সহ্য করে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শ্রমিকরা প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ছয় দিন দৈনিক দশ থেকে বারো ঘন্টা একটানা কাজ করেন। আবার এদের মধ্যে কেউ, কেউ একটানা চৌদ্ধ-পনেরো ঘন্টা কাজ করে থাকেন। বস্ত্র শিল্পের অধিকাংশ শ্রমিকরাই বস্তিতে খুপড়ি ভাড়া করে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। অসুস্থ হলে বেতন থেকে ওরা বঞ্চিত হন এবং চিকিৎসার জন্য তাদের কোনো সুবন্দোবস্তও নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে চাকুরী থেকে বঞ্চিত হতে হয়।

ন্যূনতম বেতনে সাধ্যাতীত খাটুটি খেটেও দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা ও মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করার এ ধরণের জলন্ত দৃস্টান্ত অত্যন্ত দুঃখজনক। বস্ত্র শিল্পে অগ্নিকান্ড ঘটনাও বিরল নয়। প্রতি মাসে অগ্নিকান্ডে পোশাক কারখানার শ্রমিক মৃত্যুর সংবাদে দেশবাসী ঔদাসীন্য, এ ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগী হওয়া উচিৎ, বস্ত্র শিল্পে অগ্নিকান্ডে মৃত শ্রমিকদের ছেলে মেয়েদের ভরণ-পোষনের ক্ষেত্রে একটি নিয়ম বিধান করা উচিৎ। অতীতে গার্মেন্ট শিল্প কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় অনেক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে এবং অনেককে হাসপাতালে চিকিৎসা পঙ্গুত্ব জীবন কাটাকে হচ্ছে। যে সমস্ত পরিবার শুধু একজন ব্যক্তির আয়ের উপর নির্ভরশীল এবং তাকেই যদি গার্মেন্টের অগ্নিকান্ডে পঙ্গুত্ব অথবা মৃত্যুর মুখে পতিত হয় সেক্ষেত্রে তাদের ছেলে মেয়ে ও স্ত্রীর ভরণ-পোষণের দায়িত্বভার কে নেবে? তাদের ক্ষেত্রে গার্মেন্টের মালিকদের করণীয় কি ? সরকারেরই বা কি পদক্ষেপ নেয়া উচিত? ইত্যাদি বিষয়গুলো বিচার ও বিশ্লেষণ করে অতি সত্ত্বর দেশের শ্রম আইনের আওতায় আনা জরুরি। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে অর্জিত হয় অজস্র মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা, যাদের শোষণ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাকা গতিশীল হচ্ছে, তাদের প্রতি সরকারের সুদৃষ্টি অত্যাবশ্যক। বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্পের উক্ত শ্রমিকদের উপর সরকারের সদিচ্ছা না পেলে কোন একদিন হয়তে বস্ত্র শিল্পের শ্রমিকদের অক্লান্ত চেষ্টা বা আগ্রহ থাকবে না এবং দেশের গার্মেন্ট শিল্পে পারদর্শী শ্রমিকদের অনটন দেখা দেবে। আর বস্ত্র শিল্প খাতে দৈনন্দিন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হ্রাস পাবে।

বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বৃহত্তর স্বার্থে ও দেশে বস্ত্র শিল্পকে প্রাণধারণ করে রাখার লক্ষে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে শ্রম আইন সংশোধন করা জরম্নরী প্রয়োজন। নতুবা শুধু গার্মেন্ট কর্মী সম্প্রদায়ই নয়, সমগ্র দেশ ও জাতি সমধিক ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

মুন্সী বশির