স্বাধীনতা
নুর মোহাম্মদ কাজী, বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ৩১, ২০১৩


স্বাধীনতা


নুর মোহাম্মদ কাজী



শৈশব-কৈশর শেষে তারুন্যে একদিন
মা আমাকে বলেছিলেন, বা’জানরে মায়ের আঁচল ছেড়ে
নিজ পায়ে দাঁড়াবার সময় হয়েছে তোমার।
বাপ-মা অনন্তকাল থাকে না কাহারো। অধীনতা ভালো নয়।
অধীনেরা স্বাধীনতার স্বাদ কবু বুঝিতে পারে না।
সেই থেকে স্বকীয়তা, স্বাধীনতা, মুক্তির স্বাদ পাব বলে,
কংকর বিছানো পথে যাত্রা হল শুরু।

স্বাধীনতা তো্মাকে পাবার জন্য সেই কবে এক আলোকিত স্নিগ্ধ সকালে,
মায়ের স্নেহের কোল ছেড়ে, বের হনু পৃথিবীর পথে।
মায়ের চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু জল, স্নেহ-ভালোবাসা, প্রিয় গ্রাম,
সব কিছু পিছে ফেলে, বিরান বিলের শেষে ডাকাতিয়া নদী,
তীরে তার নৌকা বাঁধা; মাঝি যাবে মেঘনা মোহনায়।

ডাকাতিয়া!

ক্ষিনাংগীনী স্রোতস্বিনী প্রেয়সী আমার,
বুকে তব বৈশাখের তপ্ত ভালোবাসা, তারুন্য জোয়ার;
আমারে ভাসিয়ে নাও নীলাক্ষী নয়না নদী মেঘনা মোহনায়।
প্রিয়তমা নদী,

তব বুকে এতো জল, এতো ভালোবাসা!
নৌকার গলুইয়ে বসে আজলা ভরে পান করি তব জল, মিটে নাকো তৃষা।
চেয়ে দেখি পাড়ের দৃশ্যাবলী-সবুজাভ গ্রাম, প্রিয় মোর দেশ।
চেয়ে দেখি স্বাধীন পাখীর ঝাক, সাদা বক,

পানকৌড়ি উড়ে যায় সুদূর আকাশে।

আহা স্বাধীনতা তুমি পাখীদের পাখা?
আমাকে দিল নাকো প্রভু।



বদর বদর বলে মাঝি এলো মেঘনা মোহনায়।

উত্তাল তরংগমালা বুকে তার, স্বাধীন, স্বাধীন বলে ধায় স্রোতরাশি।

আমি এক বিস্মিত তরুন, তরঙ্গে তরঙ্গে খুঁজি স্বাধীনতা!



ওগো মেঘনা!

বলো দেখি স্বাধীনতা কোথা পাবো?
উত্তাল তরংগমালা বুকে নিয়ে কোথা যাও,
বলো দেখি মোরে, স্বাধীনতা কোথা পাবো?
মেঘনা বলে, “চল মোর সাথে সমুদ্রে বিলীন হই, স্বাধীনতা পেয়ে যাবো”।
আমি বলি, “প্রিয়তমা, জলে কোন রং নেই,
সমুদ্রে মিশিয়া গেলে স্বকীয়তা খুঁজে আমি পাবো নাকো আর।
আমি চাই স্বকীয়তা, স্বাধীনতা, স্বপ্নের দেশ,
সবুজাব শস্যক্ষেত্র, নিজগ্রামে নির্বিঘ্নে বসতি।
সব কিছু ছেড়ে দিয়ে কারো সাথে মিশিবার গেলে স্বকীয়তা রবে না আমার”।
মেঘনা পরে বলে দিলা,
“প্রিয়তম বন্ধু মোর নগরীতে যাও, স্বাধীনতা, সাম্যবাদ, গনতন্ত্র, বাংলাদেশ-
এই সব বিমুর্ত ধারনাঃ তাই নিয়ে নগরীর মানুষেরা সদা ব্যস্ত থাকে।

এই তো নগরী, প্রিয় ঢাকা, সুউচ্চ দালান কোঠা,

আর রাতের আঁধার শেষে সুর্যকরোজ্জল মানুষের ভীড়।

স্বাধীনতা কারে কয়- মনে হলো এরা সব জানে।

আমি জানি স্বাধীনতা হলো মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার নাম।

তবে এরা কেন এত অবনত?

হঠাত এক দিন দেখি নগরীর মানুষদের রাগীকণ্ঠ,

উচ্চধবনি,ছুটে যাচ্ছে অসংখ্য মিছিলঃ
কেন্দ্রস্থল পল্টন ময়দান।
চেয়ে দেখি মাথায় তালের টুপী, কাশফুল দাঁড়ি, নিপীড়িত মানুষের মুক্তি দাতা,
শোষকের যমদূত-‘বিদ্রোহের নবী’, কৃষকের মজুরের নয়নের মনি,
আমাদের সকলের প্রাণপ্রিয় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী।
উঁচুমঞ্চে সুর্যের বিপক্ষে এসে দাঁড়ালেন তিনি।
জলদগম্ভীর কণ্ঠে কহিলেন, ভাই ও,
জালেমের বিরুদ্ধে আজ মজলুমের লড়াই, শোষনের বিরুদ্ধে আজ সমগ্র মেদেনী।
ক্ষুধার আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে, চেয়ে দেখুন শোষকের শেষ দূর্গ।
এ সময়ে আসুন, নির্মান করি নিপীড়িতের রাষ্ট্র-যন্ত্র, স্বপ্নের দেশঃ
যথা রবে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাঃ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিত্ত-বিনোদন;

আর রবে স্বাধীনতা, সাম্যবাদ, গনতন্ত্র, নিজস্ব পতাকা।
এই শুনে লক্ষ কণ্ঠস্বর-ধবনি-প্রতিধবনি তোলেঃ জয় বাংলা, জয় বাংলাদেশ।

আমিও তো এই চাই, বলে মিছিলে সামিল হই,

স্বাধীনতা-মুক্তি চাইঃ “অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই”

মিছিলে যায় দিন, মিছিলের তরংগমালা যুদ্ধের দামামা,
আমি এক মুক্তিযোদ্ধা, ভীতিহীন স্বাপ্নিক যুবক।
অলি-গলি, খাল-বিল, গ্রাম-গঞ্জ, গেরিলা জীবন,
কোথায় ভাসিয়ে নিল এ আমার তারুন্য-যৌবন।

ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত মূল্যে কেনা হলো-
স্বাধীনতা, সাম্যবাদ, গনতন্ত্র, প্রিয় বাংলাদেশ।

কিন্তু হায়! স্বাধীনতার উষালগ্নে, জেনেটিক দোষে দোষী
কতিপয় দাশের সন্তান-বলে কি না!
-স্বাধীনতা, সাম্যবাদ, গনতন্ত্র বাংলাদেশ-চাই না আমরা।
পরের গোলামী ভালো, প্রভু থাকা ভালো, প্রভুহীন থাকিতে পারিনা।
সেই থেকে রক্ত-দোষে দোষী যত গোলামের প্রতিপক্ষ হয়ে গেনু আমি।
প্রভুমানা গোলামেরা পথরুদ্ধ করে ফের দাঁড়ালো আমার।
বিশ্বব্যাপী শোষনের জটাজাল, গোলামের উত্থান-
ইশ্বর, ইশ্বর বলে স্বোল্লাশে জিকির তোলে যত রাজাকার!
আয়েসে ঢেকুর তুলে বলেঃ ওহে মুক্তিযোদ্ধা তুমি যাবে কই?
যুদ্ধে আস? যুদ্ধের নেই শেষ। আমরা সাম্রাজ্যপন্থী-ইশ্বর মানি,
বিশ্বেশ্বরের হাত দেখ কি বিশাল-বিস্তৃত!
মুক্তি বলে কিছু নেই-অধিনতায় আছে সর্বসুখ।
স্বাধীনতা, সাম্যবাদ, গনতন্ত্র বললেই, “কুচল দেংগে শির”।

জানি নিপীড়িতের মুক্তিযুদ্ধ চলে প্রতিদিন- প্রতি দেশে দেশে।
আমি এক দেশত্যাগী মুক্তিযোদ্ধা-আজীবন যুদ্ধেরত।
রক্তে-ভেঁজা লালে লাল পতাকা আমার।
প্রতিপক্ষ নিপীড়ক রাষ্ট্র-যন্ত্র, বৈষম্যের সমাজ,
উচ্চ-তুচ্চ ভেদাভেদ, স্বেচ্ছা দাসত্ত্বপনা, আলখেল্লা গোলামী।

প্রিয় বাংলাদেশ,
তব স্বাধীনতা, সাম্যবাদ, গনতন্ত্র আজ যবে ফেরারী আসামী-
নিপীড়িত মানুষের বাঁচিবার স্বপ্ন যথা ধুলায় লুণ্ঠিত।
সে সময়ে চেয়ে দেখ,
তব মুক্তিযোদ্ধা সব চলে যাচ্ছে নকশালী জংগলে।