আদর্শবাদ বিতর্কঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ
নূর মোহাম্মদ কাজী, সোমবার, এপ্রিল ০১, ২০১৩


আদর্শবাদ বিতর্কঃ বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ
নূর মোহাম্মদ কাজী
বাংলাদেশের রাজনীতিকে ঘোলাটে করার জন্য বিগত ৪২ বছর ধরে নানা বিভ্রান্তির আদর্শ ও শ্লোগান চালু করা হয়েছে। তার মধ্যে "বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালি-" এ শ্লোগানটি খুবই বিভ্রান্তি কর। এ শ্লোগানটির রাজনীতিকরন কোন ধর্ম জাতীয়তাবাদীরা করেনি, করেছে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা। এ শ্লোগানের ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদের কোন বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে কিনা, তা আমরা তলিয়ে দেখতে চাই।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ
পাচঁ হাজার বছর ধরে আমাদের পুর্বপুরুষরা বাঙালি ছিলেন। দেড় হাজার বছরা আগে আমাদের অগ্রজগন "বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার মুসলমান" হয়েছেন। এতে তাদের বাঙালিত্ত্বের আদিস্বত্তা নষ্ট হয়ে যায়নি। এর প্রমান বাঙালি হিসেবেই আমরা স্বাধীনতার লড়াই করেছি এবং বাংলাদেশ অর্জন করেছি। বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খৃষ্টান, বাংলার মুসলমান হিসেবে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি নাই। তবে এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ হলো একাধারে এথনিক,ভাষিক, স্থানিক ও ধর্মীয় জাতীয়তাবোধের দ্বারা নির্মিত জাতীয়তাবাদ। এ জাতীয়তাবাদ বিকাশের ভিত্তিমূলে রয়েছে ইসলামের অসাম্প্রদায়িক ভুবন চিন্তা। আর বৌদ্ধ ধর্মের অহিংস নীতি। এ কারনে বাঙালিরা হলো অসাম্প্রদায়িকতা ও অহিংস নীতি বোধের জাতি। এ দু’টি নীতি বাঙালি জাতির সংগ্রামী অর্জন। এ নীতির ভিত্তিতে বাঙালিরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেচে। এ রাষ্ট্র অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক মর্যাদাবোধের রাষ্ট্র। সকল মানুষের থাকবে এখানে সমান অধিকার।

বাঙালির মনভুমি নির্মিত হয়েছে সমতার সাধনায়। এ জন্য এ জাতি হাজার বছর ধরে মুক্তির সংগ্রাম করছে। বাঙালির জাতীয় জীবনে যে দু’টি ধর্ম প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে তার একটি ছিল বৌদ্ধ ধর্ম, অপরটি হলো ইসলাম ধর্ম। উভয় ধর্ম বাঙালির জীবনে সমতার বানী নিয়ে এসেছিল। তখন সমাজ ও রাষ্ট্র ছিল অসাম্যমুলক, জাত-পাত দ্বারা শাসিত, সামন্ততান্ত্রিক ও নিপীড়ন মুলক। নিপীড়ন বাঙালির মনে প্রতিরোধ চেতনার জন্ম দেয়। নিপীড়নের দু’টি ভিন্ন ভিন্ন সময় কালে এ ধর্ম দু’টির ধর্মগুরুগন সাম্যের বানী নিয়ে আসেন। বাঙালি জনগোষ্ঠী এ মুক্তির বানী গ্রহন করেছিলেন। বাঙালির প্রতিরোধের প্রকাশ ঘটে প্রথমে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন ও আরো পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহনের মাধ্যমে। এ কারনে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নির্মানে এথনিক,ভাষিক, স্থানিক উপাদানের মধ্যে ধর্মীয় উপাদান ও একটি মৌলিক উপাদান। বাঙালি জাতীয়তাবাদ থেকে ধর্মীয় উপাদান নষ্ট করে দেবার জন্য এখন চেষ্টা হচ্ছে? কেন?



ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ

সামন্ত যুগে ধর্মের সাথে এথনিক,ভাষিক ও স্থানিক জাতীয়তাবাদের বিরোধ খুব কমই হয়েছে। মুঘল সাম্রাজ্যের কালে বিন্যাস করা ভারতের এথনিক,ভাষিক, স্থানিক জাতীয়তাবাদ আজও বিদ্যমান আছে, আছে সামন্ততন্ত্র অব্যাহত। তবে পুঁজিবাদের যুগে এসে ইউরোপ এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। ইউরোপ যখন সামন্তবাদ থেকে বের হবার জন্য রেনেঁসা ঘটায়, রাষ্ট্রকে ধর্মের শৃংখল থেকে মুক্ত করে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটায়, জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের পত্তন ঘটায়, তখন ভারতের সামন্তবাদী রাজারা নিজেদের শ্রেণী স্বার্থ রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে কলোনিয়াল জোয়াল কাঁধে তুলে নেয়। এতে ভারতের অগ্রগতি সেই যে পিছু ছুটা শুরু করল, তা আজ ও শেষ হয়েছে কি?

এখানে উল্লেখ্য, পুঁজিবাদ ধর্মাদর্শকে ভিত্তিমূলে রেখেই গড়ে উঠেছে। পুঁজিবাদ জাতীয়তাবাদী স্তর পার হয়ে সাম্রাজ্যবাদের স্তরে প্রবেশ করার সময় আদর্শ হিসেবে ধর্মকেই বেছে নিয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল এক ধর্মের ছায়াতলে পুঁজিবাদী ম্যনেজমেন্টের কাজ চলবে। চলছিলও বেশ। পুঁজিবাদের আভ্যন্তরিন দুর্বলতার কারনে এখন কোথায় যেন বাঁধার প্রাচীর এসে দাঁড়িয়েছে। সামনে আর এগোনো যাচ্ছে না। তদুপরি দেখা যাচ্ছে এখন পুঁজিবাদের নানা শক্তিশালী শরীক রাষ্ট্রেরও উত্থান হচ্ছে। দেখা দিচ্ছে প্রবল প্রতিযোগীতা। এ অবস্থায় সবকিছু নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য পুঁজিবাদী বিশ্বম্যানেজমেন্টের নয়াতত্ত্ব নির্মানের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ নয়া বিশ্বতত্ত্বই হলো ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ-ধর্মভিত্তিক একবিশ্ব তত্ত্ব ( Religion based one world order)। কারন এখন আর এককভাবে কোন ধর্ম গ্লোবালাইজড পুঁজিবাদী দুনিয়া চালাতে পারছে না। পুঁজিবাদী আদর্শ হিসেবে সকল ধর্মকেই পুঁজিবাদী দুনিয়ার চাকা ঠেলার পবিত্র কর্ম করতে হবে। এ কারনে ধর্মের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব অতীতের যে কোন সময়ের চাইতে অনেকগুন বেড়ে গেছে। মনে রাখতে হবে যে, ধর্মকে পুঁজিবাদীরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার একমাত্র পরিক্ষিত আদর্শ হিসেবে পেয়েছে। পুঁজির আন্তর্জাতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আজ ধর্মসমূহই একমাত্র কার্যকর আন্তর্জাতিক আদর্শবাদ। বাংলাদেশের সকল ধর্মই আজ পুঁজিবাদের আন্তর্জাতিক ভূমিকা পালন করার জন্য জান কোরবান করছেন। দেশের ক্ষমতাকাংখী দলগুলু এ পবিত্র সংগ্রামে রেফারীর ভুমিকা পালন করছে।



ক্ষমতার দ্বৈত-স্বত্ত্বাবাদ

বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে এতক্ষন আমরা আলোচনা করেছি। এ দু’ জাতীয়তাবা দের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব-বিরোধ আছে কি? ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন নানাভাবে দ্বৈত-স্বত্ত্বাবাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ক্ষমতার খেলায় এ দ্বৈত-স্বত্ত্বাবাদ সর্বত্র কাজ করে। ক্ষমতা-অধীনতা-প্রতিরোধ-এটাই ক্ষমতার দ্বৈত-স্বত্ত্বাবাদ (Dualism)। যেখানেই ক্ষমতা, সেখানেই অধীনতা, আর যেখানে অধীনতা সেখানেই প্রতিরোধ। আমরা এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক কিছু আলামত বর্ননা করতে চাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এদেশের মানুষের সামাজিক স্বপ্ন পুরন করার জন্য শাসক শ্রেণীর দরকার হয়। আগে ছিল বিদেশী শাসক। জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ করে আমরা বাঙালির জন্য স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। এখানে বলে রাখা ভালো বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ মানুষ হলেন মুসলমান। এখন কারা হবে এদেশের ক্ষমতাবান শাসক শ্রেণী? বাঙালি জাতীয়তাবাদের ঝান্ডাবাহিরা ক্ষমতাসীন হলেন। কি হবে দেশ শাসনে বাঙালির জাতির জন্য আদর্শবাদ? স্বাধীনতার আগে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন তাদের আদর্শবাদ কি ছিল? ইসলাম ও পুঁজিবাদ। স্বাধীনতার আগের পাকিস্তান রাষ্ট্রকে বাংলার ৯০ শতাংশ মুসলমান নিজ রাষ্ট্র ভাবতে পারেন নাই। কারন শাসক বিদেশী। বাংলাদেশের নয়া শাসকরা বিদেশী নন। তবে পরিতাপের বিষয় ক্ষমতার দ্বৈত-স্বত্ত্বাবাদী নিয়মে বাঙালি হলেন আবার অধীন। কারন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছে সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র-স্বত্ত্বা বিকাশের দাবীতে। এ দাবী ১৯৭৫ সালের পর আর এগুতে পারেনি। এদেশের সকল মানুষই ধর্মাদর্শের দ্বারা চালিত। এর ৯০ শতাংশ মানুষ ইসালামী আদর্শদ্বারা চালিত। আর বাকি ১০ শতাংশ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃষ্টান ধর্মাদর্শ দ্বারা চালিত। এদেশে ক্ষমতার রাজনীতিতে ধর্মাদর্শই গুরুত্বপুর্ণ আদর্শ। এ কারনে ধর্মাদর্শবাদীরা স্বাধীনতার পরপরই ধর্মকেন্দ্রিক নিজ নিজ ক্ষমতাবলয় নির্মাণ কাজ শুরু করে। এ কারনে স্বাধীনতার উষালগ্নেই ক্ষমতার শীর্ষ বিন্দুতে বসে তথাকথিত “নকশাল” দমনের নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা “সমতা, মানবতা ও সামিজক ন্যায় বিচারে”র আদর্শকে প্রতিপক্ষ করে তোলা হয়। ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ আর বাঙালি জাতীয়তাবাদককে দ্বান্দ্বিক অবস্থানে নিয়ে আসা হয়। বাঙালিরা আবার ক্ষমতার রাজনীতিতে অধীনস্থ হয়ে পড়ে। সাম্যবাদী চেতনা ধর্মবাদের আন্তর্জাতিক খেলায় হেরে যায়। এখন ধর্মবাদীরা এ খেলাকে সাম্প্রদায়িক রুপ দেবার চেষ্টা করছে।

পরিশেষে

ধর্ম ধার্মিকের মনে ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদের বোধ জাগায়। তবে এথনিক, ভাষিক কিংবা স্থানিক জাতীয়তাবোধকে ভোতা করে দেয়। ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদের খেলায় বাঙালির রাষ্ট্র-স্বত্তাকে, এমন কি তাদের অর্জিত স্বাধীনতাকেও বিপন্ন করে তুলতে পারে। ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদ এখন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আদর্শকে বিপন্ন করে তুলেছে। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদীরা লাভবান হচ্ছে। বাংলাদেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। আমরা আগেই উল্লেখ করেছি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ নির্মানে রয়েছে এথনিক,ভাষিক, স্থানিক ও ধর্মীয় জাতীয়তাবোধের উপাদান। তবে ধর্মীয় বর্নবাদ ও ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিমূল গড়ে উঠেছে। বর্তমানে ধর্মীয় আন্তর্জাতিকতাবাদীরা বিদেশের সাথে হাত মিলালেও বাঙালি জাতি অধীনতার বিরুদ্ধে লড়াই করবেই করবে। অতীতের মতই তারা নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখবে। এদের রক্তমূল্যে অর্জিত বিজয় কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।

জয় বাংলা-জয় বাংলাদেশ।