বাঙালির মনভূমি নির্মাণ তত্ত্বঃ গ্রন্থ, মন্ত্র ও কৃষ্টি-কালচার
নূর মোহাম্মদ কাজী, সোমবার, এপ্রিল ২৯, ২০১৩


বাঙালির মনভূমি নির্মাণ তত্ত্বঃ গ্রন্থ, মন্ত্র ও কৃষ্টি-কালচার
নূর মোহাম্মদ কাজী

বাঙালির মনভূমি নির্মাণে গ্রন্থ, মন্ত্র ও কৃষ্টি-কালচারের ভূমিকা রয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। আমাদের গ্রন্থ-মহাগ্রন্থ আছে, মন্ত্র-মহামন্ত্র আছে, আছে কৃষ্টি-কালচার। আমাদের মধ্যে কেহ মহাগ্রন্থপন্থী, কেহ মহামন্ত্রপন্থী, আবার কেহ বা হলেন কৃষ্টি-কালচারপন্থী। এ তিনপন্থী মানুষের মনভূমি বিশ্লেষন করে আমরা বাঙালির মনভূমি নির্মাণ তত্ত্ব খুঁজে পেতে চাই।
বাঙালি জনগোষ্ঠী
প্রথমেই আমরা বাঙালি জাতি-স্বত্বার বিকাশ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। বিগত পাঁচ হাজার বছর ধরে বঙ্গীয় বদ্বীপে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীই হলো বাঙালি জনগোষ্ঠী। অস্ট্রো-এশিয়াটিক এ জনগোষ্ঠীর আদি নাম সাঁওতাল জনগোষ্ঠী। আদিতে এরা প্রকৃতি পুজারী ছিলেন। সূর্যকে সকল ক্ষতার উত্স মনে করতেন। এ কারনে সূর্য পুজা করতেন। সাঁওতাল ভাষায় “বঙ” শব্দের অর্থ সূর্য। এরা এদের এ আরাধ্য ইশ্বরের নাম দিয়েছিলেন “বঙা” বলে। এক সূর্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠার কারনে সাঁওতালদের এ বঙা হলো এক ইশ্বর। এ এক ইশ্বর ধারনার ভিত্তিতে সাঁওতালদের মধ্যে ঐক্য-শৃংখলাবোধ (Unity of Uniformity) গড়ে উঠে। এ বঙা নাম থেকেই “বাঙাল” এবং “বাঙালি জাতি-স্বত্তা” বিকাশ লাভ করে। বহিরাগতরা এসে বাঙালি জাতির এ প্রারম্ভিক ইতিহাস মুছে ফেলে। এর বিপরীতে বহিরাগতরা নিজেদের ইতিহাসকে বাঙালি জাতির মনভূমিতে বপন করেন। এ প্রেক্ষাপটে আমরা মহাগ্রন্থপন্থী, মহামন্ত্রপন্থী ও কৃষ্টি-কালচারপন্থীদের নিয়ে আলোচনা করবো।
গ্রন্থ-মহাগ্রন্থপন্থী
বাংলাদেশের মানুষদের মধ্যে হাতেগনা স্বল্প কিছু লোক ছাড়া সবাই গ্রন্থ-মহাগ্রন্থপন্থী। ইসলাম, হিন্দুইজম, খৃষ্টিয়ানিটি ও বৌদ্ধইজম এদেশের অন্যত প্রধান ধর্ম। কোরান, বেদ, বাইবেল ও ত্রিপীটক যথাক্রমে এ ধর্মগুলুর মহাগ্রন্থ। কোরান আরবী ভাষায়, বেদ সংষ্কৃতি ভাষায়, বাইবেল আরবী ভাষায় এবং ত্রিপীটক পালি ভাষায় লিখিত মহাগ্রন্থ। এ মহাগ্রন্থগুলু সাধারন ধার্মিকগন পড়তে পারেন না, বুঝতেও পারেন না। ধর্মগ্রন্থ জানা লোকের সংখ্যা সব ধর্মেই খুব কম। ধর্ম জ্ঞান চর্চার বিষয়। স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার গুড়-রহস্য বুঝার জন্য জ্ঞান সাধনার প্রয়োজন। সব মানুষের পক্ষে জ্ঞান চর্চা সহজ হয় না। এ জন্য আধ্যাত্ত্বিক জ্ঞান সাধক শ্রেণী গড়ে উঠেছে। এরা ধর্মীয় গুরু। সব ধর্মেই ধর্মের গুরু শ্রেণী রয়েছেন। ইসলাম ধর্মে আলেম-ওলামা, হিন্দু ধর্মে ব্রাম্মন ঠাকুর, খৃষ্টিয়ান ধর্মের পোপ-পাদ্রী ও বৌদ্ধ ধর্মের ভিক্ষু শ্রেণী রয়েছেন। ধর্ম সমাজে এরা সর্বোচ্চ আসনের অধিকারী। এরা সমাজ ও রাষ্ট্রের আদর্শিক ঐক্য-শৃংখলা অব্যাহত রাখার শৈক্ষিক দায়িত্ব পালন করেন। এরা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের ধর্মীয় গুরু শ্রেণী (Faith Professional)।
মন্ত্র-মহামন্ত্রপন্থী
আমরা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার গুড়-রহস্য বুঝার জন্য জ্ঞান সাধনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছি। ধর্মীয় গুরু শ্রেণী গড়ে উঠার কথা বলেছি। কোন কোন ধর্মে বংশ পরম্পরা ধর্মগুরু শ্রেণী রয়েছেন। ধর্মগুরুর সন্তানরা ধর্মগুরু হবেন। যেমন ব্রাম্মণের ছেলে ব্রাম্মণ হন, পীরের ছেলে পীর হন। এভাবেই অতীতে ভারত বর্ষের ধর্ম সমাজ ও সামাজিক ক্ষমতার কর্তৃত্ব বিন্যস্থ হয়েছে। সমাজ ক্ষমতায় আশীন এ কর্তৃত্ত্বশীল শ্রেণী চায়নি তাদের হাত থেকে ম র্যাদাশীল এ কর্তৃত্ত্ব অন্যের হাতে চলে যাক। এ জন্য তারা সাধারন ধার্মিকদের গ্রন্থ-ধর্মের চাইতে মন্ত্র-ধর্মের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছেন। সাধারন ধর্মাবলম্বীদের তারা মন্ত্র শিক্ষার কথা বলেছেন। গ্রন্ত্রকে সাধারন মানুষদের কাছে দেননি। রেখেছেন নিজেদের কাছে। পরে এ গ্রন্থ দিয়ে গেছেন নিজ সন্তানদের কাছে। ঠাকুর পুত্র বা পীর পুত্র গ্রন্থ-মন্ত্র মুখস্ত করেছেন। এবং ধর্মের গ্রন্থ-মন্ত্র পাঠ করার গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ভাবে ধর্ম সমাজে পীরবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের স্তর বিন্যাস ঘটে। পীর বা ব্রাহ্মণ শ্রেণী অধিপতি শ্রেণী (Master) এবং গ্রন্থ ও মন্ত্র বঞ্চিত শ্রেণী অধীন শ্রেণীতে (Slave) পরিনত হয়। ধর্ম সমাজে ধর্মের অধিপতি শ্রেণী হলো অবসরভোগী শ্রেণী (Leisuring class)। আর অধীণ শ্রেণী হলো কর্মজীবী শ্রেণী (Labouring class)। যুগে যুগে এ অবসর ভোগী শ্রেণী নিজেদের সামাজিক অবস্থান ঠিক রাখার জন্য ক্ষমতার মদদ দাতা ছিলেন। এ ধারাবাহিকতা আজো অব্যাহত রয়েছে। পীরবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদের ক্ষমতার ভিত একই ধারাবাহিকতার ফসল। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে আধ্যাত্ত্বিকতা নিয়ে নানা পার্থক্য থাকলেও জাগতিক ক্ষমতার অবস্থান নিয়ে ধর্মগুরুদের মধ্যে সমজোতা হয়ে যায়। এ ব্যাপারে দক্ষিন এশিয়ার দেশশগুলুর পীরবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা জাগতিক ঐক্যের এক ইস্পাত-দৃঢ় সুফীবাদী আদর্শ-ভিত্তি নির্মাণ করেছেন। তবে ইউরোপ এ ধরনের অবস্থান থেকে বের হয়ে মুক্তির নবদিগন্ত উন্মোচন করেছে। রেঁনেসা ইউরোপকে মুক্তি দিয়েছে। দক্ষিন এশিয়া “দেবে আর নেবে, যাবে না ফিরে, এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে”-কবির এ কল্পনা আজ বিপরীত গতি নিয়েছে। আমার জানা মতে পশ্চিমা সমাজের কোন ব্যাক্তি দক্ষিন এশিয়ার কোন দেশে এসে বসতি স্থাপনের চিন্তা করেন না। বরং এসব দেশের নিপীড়নমুলক ধর্ম সমাজ পিছে ফেলে আম রা হাজারে হাজারে “পশ্চিমের মহামানবের দেশে” পিঁপড়ার মত চলে আসছি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ব কবি হয়েছেন, বাঙালির কবি হতে চাননি। তিনি আজ বেঁচে থাকলে দক্ষিন এশিয়ায় তার স্বপ্নের “ভারত মাতা”র দেশে থাকতেন কি না? এ প্রশ্ন কারো কারো মনে জাগতে পারে। এখন এসব দেশগুলুতে একটি শ্লোগান য্যুত্সইঃ “পীরবাদ জিন্দাবাদ”, “ব্রাহ্মণ্যবাদ জিন্দাবাদ”! অধীনতার জয় হউক।
কৃষ্টি-কালচারপন্থা
ধর্ম সমাজেই অধিপতি শ্রেণী ও অধীনস্থ শ্রেণীর বিন্যাস ঘটে। ইউরোপে চার্চের অধিপতিদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধ গড়ে উঠে। চার্চ কেন্দ্রিক সাঁ ম ন্ত শ্রেণী শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে গড়ে উঠা জাতীয়তাবাদী বুর্জোয়া শ্রেণীর কাছে হেরে যায়। সামন্ত উত্পাদনের স্থলে পুঁজিবাদী উত্পাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠে। সমাজে নয়া শ্রেণী বিন্যাস ঘটে। শিল্প মালিক শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণী। শিল্প মালিক শ্রেণী সামন্ত শ্রেণীর সাথে লড়াইয়ে জেতার জন্য শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ শক্তির মদদ চায়। শিল্প মালিক শ্রেণী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের জন্য ইউরোপীয় রেঁনেসার আলোকে শ্রমিক শ্রেণীর সামনে জাতীয়তাবাদ, গনতন্ত্র ও সামাজিক সাম্যের নীতিকে ঐক্যের নীতি হিসেবে নিয়ে আসে। এবং এর ভিত্তিতে জাতীয় কৃষ্টি-কালচার গড়ার উদ্যোগ গ্রহন করে। যার লক্ষ্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয় ঐক্য-শৃংখলাবোধ গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমা সমাজ সফল হয়। এখানে আর ধর্ম বিজ্ঞান সাধনার বিপক্ষ্যে দাঁড়াতে পারলো না। বিজ্ঞান পশ্চিমা সমাজের জন্য সুফল এনে দিল। ইউরোপের দেশে দেশে জাতি-জাগৃতি এলো। জাতীয় জাগৃতি নিয়ে ইউরোপ সামনে এগিয়ে গেল।
আমরা বলছিলাম জাতীয় কৃষ্টি-কালচার গড়ার কথা। একটি আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার থাকতে হবে। যে রাষ্ট্রের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার থাকে না, সে রাষ্ট্র তাসের ঘরের মত ভেংগে পড়ে। আধুনিক রাষ্ট্র মাত্রই নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার দ্বারা চালিত হয়। এখন প্রশ্ন উঠছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ কি নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল? এ কৃষ্টি-কালচারের রূপ রেখা কিরুপ ছিল? বিগত ৪২ বছরে বাংলাদেশের কোন সরকার এদেশের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী কালাচারাল পলিসি (Cultural policy) তৈরী করেছে কি? কালাচারাল পলিসি না থাকার কারনে ধর্ম ও কালচার পরস্পরের বিরুদ্ধে এসে দাঁড়াচ্ছে।
ধর্মের সাথে কৃষ্টি-কালচারের সম্পর্ক কি? ধর্ম মানুষের মনে আধ্যাত্ত্বিক চেতনার ভিত নির্মাণ করে। বাস্তবতার কঠোর অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য মানুষ আধ্যাত্ত্বিক চেতনায় মগ্ন হয়। তবে বেঁচে থাকার দৈনন্দিন সংগ্রামে মানুষকে উত্পাদন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হতে হয়। মৌলিক চাহিদা মিটানোর জন্য তাদেরকে কঠোর সংগ্রাম করতে হয়। এ ছাড়া স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার গুড়-রহস্য বুঝার জন্য মানব গোষ্ঠিকে এক আধ্যাত্ত্বিক ঐক্য-শৃংখলাবোধ গড়ে তুলতে হয়। এর ভিত্তিতে বাঙালি জনগোষ্ঠী বেঁচে থাকার ক্ষমতা বলয় তৈরী করে। এর বিনির্মাণ কাজ ধর্মকে কেন্দ্র করেই গড়ে ঊঠে। এ ক্ষমতা বলয়ই হলো তাদের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচারাল ক্ষমতাবলয় (Cultural power structure)। বাঙালি জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি-কালচারাল ক্ষমতা বলয়ের ভিত্তিমূলে রয়েছে ইসলাম ধর্ম। ১৯৪৭ সালের মধ্যেই বংগীয় বদ্বীপের বাঙালি জনগোষ্ঠী তাদের কৃষ্টি-কালচারাল ক্ষমতাবলয় নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর এ কালচারাল ক্ষমতা বলয় পুর্নতা প্রাপ্ত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি। বাঙালির কৃষ্টি-কালচারের ধারাবাহিকতাকে বিভ্রান্তির চোরাগলিতে ঠেলে দেয়া হলো। দূরাগত উর্দ্দু ক্ষমতা বলয়ের স্থলে স্থাপিত হলো উত্তর ভারতের হিন্দি কালচারের ক্ষমতা বলয়। বাঙালির হাজার বছরের সংগ্রামী কৃষ্টি-কালচারের ধারাকে বাহিরের ক্ষমতা বলয় বার বার সুত্র-ছিন্ন (Discontinue) করে দিতে সক্ষম হয়।
যারা বাংলাদেশকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা করছেন, তারা এদেশের মানুষের কৃষ্টি-কালচারালকে ভিত্তিমূলে নিয়ে কাজ করছেন। বাঙালির এথনিক জাতি-স্বত্ত্বা এদের কাছে সব চাইতে বড় ভিত্তিমুল। বাংলা ভাষা এ জাতির কৃষ্টি-কালচারের বাহন। এরা বাঙালির কৃষ্টি-কালচারাল মডেল নির্মানে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ, গনতন্ত্র ও সামাজিক সাম্যের নীতিকে সামনে নিয়ে আসছেন। এরা বলছেন, ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গনতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই তারা ১৯৭১ সালে মুক্তির লড়াই করেছেন। লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক কৃষ্টি-কালচারাল গড়ে তুলবেন। বিগত ৪২ বছর আমাদের শাষক শ্রেণী কি এ ধারায় কাজ করেছেন? তারা কি বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছিলেন? নাকি ধর্ম রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছেন?
ধর্ম রাষ্ট্র বনাম আধুনিক রাষ্ট্র
বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন তিনি হযরত মুহম্মদ (সঃ) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্রের আদলে বাংলাশের রাষ্ট্র-কাঠামো গড়ে তুলবেন। এজন্য তিনি বার বার দেশবাসীর সামনে “মদিনা সনদ” বাস্তবায়নের অংগীকার করছেন। এ সনদে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ক্ষেত্রে মুসলমান, ইয়াহুদি ও খৃষ্টিয়ান- এ তিন ধর্মের লোকদের অংশ গ্রহন নিশ্চিত করার বিষয়টি ছিল। এখানে উল্লেখ যোগ্য যে, আজ থেকে ১৮৫০ বছর আগে আরব দেশের মদিনা শহরে লোকসংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার মাত্র। মদিনা সনদ স্বাক্ষরের সময় ইয়াহুদি ও খৃষ্টিয়ানদের চাইতে মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যাল্প। মাত্র পাচঁ শ’ জন। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর কাদের ইচ্ছা পুরন করার জন্য আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী বাংলাদেশে মদিনা সনদ বাস্তবায়নের কথা বলছেন? তিনি কেন বাংলাদেশকে ধর্ম রাষ্ট্র বানাতে চান? কারা এতে উপকৃত হবে? এটা কি ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান-ভারত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পুরানা কাসুন্দি নয় কি?
আমরা জানি বাঙালি জাতি হাজার বছর ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন করছে। হাজার বছর ধরে এ জাতি প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলছে। বাঙালি বৌদ্ধ ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছে বর্ণবাদ ও অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াই করার জন্য। বৃটিশ উপনিবেশবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক পর্যায়ে এসে ১৯৪৭ সালে বাঙালিরা পুর্ব পাকিস্তান অর্জন করেছে। ১৯৪৭ সালের পুর্বে বাঙালি জাতি যেমন প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছে, এরপরও তা থেমে যায়নি। ১৯৪৭ সালের আগে বাংলা–আসামের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী নিপীড়িত বাঙালিদের সংগঠিত করেছিলেন। নিপীড়ক শ্রেণীর বিরুদ্ধে নিপীড়িতের সংগ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি বাঙালি জাতি-স্বত্বার জাগৃতি এনে ছিলেন। ১৯৪০সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এ জাতির জন্য স্বরাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পুর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা পাকিস্তানীদের আধি প ত্য মোকাবিলার লাদেশের মানুষদের ভুলিয়ে দিতে চান? হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ ালিবাঙালি চিলেন বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালি ও মুসলমান হিসেবে তিনি শহীদ হয়েছেন। তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা কেন তাঁর নিজের বাঙালি আত্ম-পরিচয়কে মুছে দিয়ে কেবলমাত্র মুসলমান পরচিতি ধারন করতে চান? শুধু কি ক্ষমতার জন্য?
মনে রাখা দরকার ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট বংগবন্ধু হত্যাকান্ডের শিকার হবার পর দিন ১৬ই আগষ্ট আওয়ামী লীগ মন্ত্রী পরিষদ বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিলেন তারা মুসলমান হবেন। এর আগের দিন পযর্ন্ত আওয়ামি লীগ নেতারা বাঙালি ছিলেন। মুসলমান হবার পর তাদের মুসলমানী পোষাক দরকার। বংগবন্ধুর লাশ ধানমন্ডির ৩২ নং রোডের বাড়ীর সিড়ির গোড়ায় ফেলে রেখে তারা মন্ত্রীত্ত্বের ভাগাভাগি ও মুসলমানী পোষাক নির্ধারনে ব্যস্ত ছিলেন। তারা এমনই আওয়ামি লীগার যে “পিতার” নাম একদিনের মধ্যেই ভুলে গেলেন। পিতার লাশ দাপনের চাইতে মুসলমান হওয়াকে এ “সন্তানেরা” গুরুত্বপুর্ন মনে করলেন। মুসলমানের পোষাক কি হবে এ নিয়ে তিন দিনব্যাপী মন্ত্রী পরিষদের বৈঠক করলেন। এবং সিদ্ধান্ত নিলেন যে, এখন থেকে মুসলমানী পোষাক হবে আচকান-টুপী-পায়জামা-পাঞ্জাবী-আর পামসু। অতীব বিস্ময়কর ব্যাপার হলো এই যে, এ নবআত্ম-পরিচিতি ধারনকারী মুসলমানদের কেহই বংগবন্ধুর নামাজে জানাজায় সামিল হলেন না। যা’ হউক, মুসলমান আত্ম-পরিচিতির সিদ্ধান্ত হবার পরপরই ভারত সরকার খন্দকার মোস্তাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারকে স্বীকৃতি দান করেন। এ স্বীকৃতিই ছিল প্রথম কোন বিদেশী সরকারের স্বীকৃতি।
এ ঘটনার পর বিগত ৩৮ বছর বাংলাদেশ মুসলমানের নামেই শাসন চলছে। এ দেশ এখন শোষকদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। আর সাধারন মানুষদের জন্য হলো এক নরকূণ্ড। যা’ হউক, শাসিতদের ধর্ম দিয়ে ঠান্ডা রাখার জন্য শাসক শ্রেণীর এখন মদিনা সনদের দরকার হয়ে পড়েছে। ব্রাহ্মণ্যবাদের দিল্লী মডেল ও পীরবাদের দেওবন্দী মডেল আজ বাংলাদেশ শাসনের জন্য খুবই দরকার। পীরবাদীরা ১৩ দফার দাবীতে ক্ষমতা দখলের রাজনীতি শুরু করেছেন। আর শাহাবাগ আন্দোলনকারীরা বলছেন তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক বাংলাদেশ কায়েম করবেন। এ জন্য বাংলাদেশের নবপ্রজন্মকে প্রগতির গান শুনাতে কোলকাতা থেকে ঢাকায় দলে দলে কৃষ্টি-কালচারের কলা-কৌশলী ও গায়ক-গায়িকা আসছেন। ভালো।


পরিশেষ
এ প্রবন্ধের প্রারম্ভে আমরা বাঙালির মনভূমি নির্মাণে গ্রন্থ, মন্ত্র ও কৃষ্টি-কালচারের ভূমিকাই যে প্রধান তা উল্লেখ করেছিলাম। এ কারনে আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের মহাগ্রন্থ, মহামন্ত্র এবং কৃষ্টি-কালচারপ ন্থীদের নিয়ে বিশ্লেষণ করেছি। সমাজ ক্ষমতা বিকাশের সাথে ধর্মাদর্শের গুরুগন কিভাবে নিজ অবস্থান ঠিক করে ফেলতেন তা আমরা দেখাতে চেষ্টা করেছি। বাংলাদেশে ধর্মাদর্শের গুরুগন ছিলেন বহিরাগত। ধর্ম-ভক্ত এবং মুরিদগন ছিলেন এ দেশের আদিবাসী। ধর্মগুরুগণ নিজেদেরকে সমাজ কাঠামোর উঁচুস্তরে বিন্যস্ত করার জন্য ধর্মের নামে যা বলা দরকার তা-ই বলেছেন। বাঙালিকে অধঃস্তন হিসেবে দেখানোর জন্য হেন কোন তুচ্চ বর্ননা নাই যা তারা প্রয়োগ করেন নাই। এদের বাণীতে বাঙালি মাত্রই ছিল “ম্লেচ্ছ, “চন্ডাল”, “নমঃসুদ্র”, “অসভ্য”। অসভ্য বাঙালিকে সভ্য বানাতে গিয়ে এরা ক্ষমতার প্রভু সেজে বসেছিলেন। ধর্মীয় ক্ষমতার কায়েমী চেতনা ভক্তদের জন্য হয়ে পড়ে অধীনতার চেতনা। ক্ষমতার আধিপত্যবাদী চেতনার কারনে অধীনরা কালক্রমে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলে। বাঙালির প্রতিরোধ সংগ্রাম এ ধারাবাহিকতারই ফসল। বাঙালিরা বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন বহিরাগত প্রভু আমদানী করার জন্য নয়, বহিরাগতদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য। এ প্রতিরোধ সংগ্রামের শিকড় বাঙালির এথনিক চেতনায় রয়েছে। এ বিষয়টির ব্যাপারে বহিরাগত ধর্ম গুরুরা সচেতন এবং এ কারনে তারা তাদের বহিরাগত রুটকে বাঙালি রুটের চাইতে গুরুত্ববহ করে তোলার অবিরত চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে গ্রন্থপন্থী ও মন্ত্রপন্থী আলেম-ব্রাহ্মণরা শত শত বছর একই প্রন্থা গ্রহন করেছেন। বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির সাথে এ আলেম-ব্রাহ্মণদের ভুবন চিন্তা একই রকম। এ ক্ষমতাকাংখী আলেম-ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে নিপীড়িত বাঙালির সংগ্রাম আজো অব্যাহত আছে। আমরা বলেছি, ধর্মাদর্শ বাঙালির সংগ্রামী চেতনার উজ্জীবনী শক্তি। মনে রাখতে হবে, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী বাংলার নিপীড়িত মানুষদের মুক্তি দানের লক্ষ্যে ধর্মকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহন করে ছিলেন। ইসলামকে তিনি নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আদর্শ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর চাইতে বড় অবদান আর কে বেশী রেখেছেন? আজ যদি বাহিরের ইন্দনপ্রাপ্ত কোন দল বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে তুলতে চায়, তাদেরকে চিনতে বাংলাদেশেরে মানুষদের বেশী সময় লাগবে না। কারন বাঙালির মননভূমি গড়ে উঠেছে নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবিরত প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তোলার মাধ্যমে। তারা সংগ্রামের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবেই।