১৯৭১-এ মুজিব চেয়েছিলেন কন্‌ফেডারেশন, তরুণ বাম ছাত্রলীগ নেতৃত্ব যুদ্ধের মাধ্যমে “স্বাধীনতা”----
আব্দুল কাদের চৌধুরী, বুধবার, মে ২২, ২০১৩


১৯৭১-এ মুজিব চেয়েছিলেন কন্‌ফেডারেশন,

তরুণ বাম ছাত্রলীগ নেতৃত্ব যুদ্ধের মাধ্যমে “স্বাধীনতা”----

আব্দুল কাদের চৌধুরী



বাংলাদেশে ১৯৭১ সনে মার্চে বাঙালির মুক্তি আন্দোলনে আওয়ামী লীগের রক্ষণশীল ধারার প্রতিভূ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের তদানিন্তন সামরিক প্রধান ইয়াহিয়ার সাথে দরকষাকষির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন তথা উভয় অংশের “কন্‌ফেডারেশন” রাষ্ট্রব্যবস্থা চেয়েছিলেন। পক্ষান্তরে, বাম ছাত্রযুব নেতৃত্ব চেয়েছিল বিলম্ব না করে সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন। আপোষে আশাবাদী প্রবীণ নেতৃত্ব, তখন কী ভেবেছিলেন — যদি ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনা ব্যর্থ হয় তা’হলে আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ কি হবে? তদ্রুপ, তরুণ বাম জাতীয়তাবাদীরাও কী ভেবেছিলেন, যদি, মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা “সফল” হয়, তাহলে তাদের লড়াইর পরবর্তী ধাপ কি হবে?

অশিক্ষা কুশিক্ষা কুসংস্কারের মধ্যযুগের রচিত ইতিহাস গ্রন্থগুলো মূলতঃ ছিল “গণ-দেবতা” বা তথাকথিত “মহামানবদের” ব্যক্তিগত গুণকির্ত্তন স্তোতিবর্ষণের একদেশদর্শী বিরস বিবরণ। সংক্ষেপে, ব্যক্তি ও পরিবার বিশেষের শাসন-শোষণকে মজবুত করার লক্ষ্যে রচিত। সেখানে সাধারণ গণমানুষ ও তাদের ভাই-বন্ধু-কর্মীদের দৈনন্দিন ভিত্তি-নির্মাণ কর্মের বস্তুনিষ্ঠ, (নিরপেক্ষ), নির্লোভী, নির্ভীক, যুক্তিগ্রাহ্য বর্ণনা সাধারণত থাকে না। তেমনটা যে আজও চলছে না—তা বলা যাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ তথা মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস রচনার বিষয়েও এসব প্রশ্নাবলী আসছে—আজ বিয়াল্লিশ বছর পরও।

ছাত্রজীবনে যাকে সতীর্থদের সাথে “মুজিব ভাই” বলতাম বিশেষতঃ ১৯৭৫ সনের পর হতে তাঁকে – “অতিমানব” না বল্‌লেও – “মহামানব” বলে কেহ কেহ আখ্যায়িত করেন। বিশেষ সাহিত্যে হয়ত বা এ অলংকারটি (বিশেষণটি) ব্যক্তি মুজিবের জন্য ব্যবহার করলেও—আধুনিক যুগের ইতিহাসের পাতায় কতটা যুক্তি-গণগ্রাহ্য—তা আলোচনার বিষয়। সাধারণভাবে, বিনা বিতর্কে, বলা যায় তদানিন্তন পূর্ব বাংলায় ব্যক্তি মুজিবের অশারিরীক উপস্থিতি, তাঁর নাম, তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর চমকপ্রদ শব্দবর্ষণ, যাদুময়ী কণ্ঠ প্রতিটি বাঙালিকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে—স্বাধীনতার লক্ষ্যে—লড়াই রণাঙ্গনে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এ কাজটি বিগত তিন শতাব্দীতে কেহই করতে পারেন নি। “শেখ সাহেবের” নামেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। মানে—কৃষক শ্রমিক কেরানীদের তরুণ ছেলে/মেয়েরা ও তাদের নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করে “অর্জন” করেছে। কৃষক শ্রমিক কেরানীদের ছেলেমেয়েরাই আওয়ামী লীগ সভাপতি “ব্যক্তি-মুজিব”কে – “মুজিব ভাই” বানিয়েছে, বঙ্গবন্ধু বানিয়েছে। ১৯৬৮-’৬৯ এর আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন অভ্যুত্থানের আমলে। তখন পুরোটা সময় তিনি জেলে। ১৯৭০-’৭১এ এই তরুণ ছাত্র শ্রমিকরাই বঙ্গবন্ধু বানিয়েছে। আন্দোলন করে, ভোট দিয়ে। যুদ্ধের পুরোটা সময়ই তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে। ডিসেম্বরের বিজয়ের মাধ্যমে তিনি হলেন, গণমানুষের দৃষ্টিতে কিংবদন্তী, মহানায়ক। কিন্তু, কিভাবে এবং কোন অর্থে?

১৯৬৮-’৬৯ সনে আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও মধ্যস্তরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতাই আইয়ুবের জেলে। আন্দোলনের প্রশ্নে এ দলটি ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল, দোদুল্যমান, নিয়মতান্ত্রিকপন্থী। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রুপের সহযোগিতায় সারা বাংলায় আউবের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আগুন জ্বালে। দৃশ্যতঃ এবং প্রকৃতপক্ষে, আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবের মুক্তি ও ৬দফা ১১দফা আন্দোলনের ধারায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বের অনুসারী হয়ে উঠে। বাধ্য হয়ে অনুসারী হতে হয়, অপ্রিয় হলেও। ডাকসু ও ছাত্রলীগের নেতৃত্বের উপরই সারা বাংলা আস্তা স্থাপন করে। দলের প্রবীণ নেতৃত্ব যারা শাসনতান্ত্রিক রাজনীতিতেই স্বচ্ছন্দবোধ করতেন, তাঁরা ছাত্রনেতাদের নেতৃত্ব অন্তর থেকে বরণ না করলেও রাজপথে মানতে বাধ্য হন। এই ছাত্র নেতারাই ১৯৭০-এর নির্বাচনে ছাত্রলীগের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রামেগঞ্জে ৬দফার ব্যাখ্যার পাশাপাশি সমাজতন্ত্র ও জাতিয়তাবাদের আলোকে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের কর্মসূচী তুমুল ঝড়ের বেগে আনাচে-কানাচে প্রচার করে। আওয়ামী লীগের রক্ষণশীল নেতৃত্ব তা ততটুকু সমর্থন বা পছন্দ করেনি। লীগের এই সংখ্যালঘিষ্ঠ অংশটি বরাবরই শাসনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পাকিস্তানের কাঠামোতেই দলের কর্মধারা নিয়ন্ত্রণ করত। মুক্তির প্রশ্নে দলটি নেতৃত্বদানে কোন কোন সময় জনতার সামনে থাকার পরিবর্তে পেছনেই থেকেছে। যখন পাঞ্জাবিদের বারবার বিশ্বাসঘাতকতার প্রেক্ষিতে বিক্ষুব্ধ জনতা “স্বাধীনতার” ঘোষণা চিৎকার করে দাবী করছিল, তখনো এর রক্ষণশীল নেতৃত্ব ইয়াহিয়ার সাথে ৬দফার (নির্বাচনী ঘোষণা) আলোকে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। এবং একপর্যায়ে ইয়াহিয়ার সাথে সমঝোতা হয়েও গিয়েছিল।

কেহ কেহ বলেন, ১৯৭১ এর ৭ই মার্চের ভাষণে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা তথা দিক নির্দেশনা দিয়েছিলেন। বৃহত্তর চিত্রপটভূমিকা হতে তা বিচারের দাবী রাখে। প্রবীণদের শাসনতান্ত্রিক ধারা ও বিপরীতের বাম লড়াকু ধারার মাঝে ৭ই মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু একটি সাময়িক সমন্বিত ও মধ্যপন্থী নীতিমালা ঘোষণা করেছিলেন। বিষয়টি পরিস্কার হবে, যদি বঙ্গবন্ধু ও তার নীতিনির্ধারক দলের ২৫শে মার্চ পর্যন্ত যে সকল কর্মতৎপরতা—বিশেষত ইয়াহিয়ার সাথে আপোষ আলোচনা করেছেন- তার বিশ্লেষণ করলে।

বঙ্গবন্ধু সে সময় দ্বি-মুখী শক্তির চাপ মোকাবেলা করতে হয়েছে। নিজের রাজনৈতিক পরিবারে/দলে বাম যুব জাতীয়তাবাদীদের বাহিরে পাক-সামরিক জান্তা ইয়াহিয়াকে। এবং উভয় শক্তির সাথেই পরস্পর বিরোধী দ্বৈত-কৌশল প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দকে নাকচ না করে তাদের কাজকর্মে পরোক্ষ কৌশলপূর্ণ নিরাপদ সায় দিয়েছেন। অপর দিকে, কার্যতঃ প্রেসিডেন্ট হাউজে সমঝোতা আলোচনা করেছেন; পাশাপাশি তাকে চাপে রাখার জন্য বঙ্গবন্ধু বাঙালি তরুণদের “প্রতিরোধ” গড়তে, “লক্ষ্য” অর্জনে “চরম মূল্য” দানে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন।

১৮ই মার্চ ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনায় মুজিব প্রস্তাব দেন, কেন্দ্রে আপাততঃ ইয়াহিয়া খানই প্রেসিডেন্ট থাকবে, প্রদেশগুলোয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রাদেশিক সরকার গঠন করবে, পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন পাবে, কেন্দ্র ( প্রেসিডেন্ট) প্রদেশের কাজ-কামে কোন হস্তক্ষেপ করবে না। প্রেসিডেন্ট মূলতঃ প্রাদেশিক সরকার গুলোর মাঝে কেন্দ্রের ও বহিঃবিশ্বের কাজ-কাম সমন্বয় করবে। অবিলম্বে সামরিক আইন উঠে যাবে। হত্যার তদন্ত ও বিচার হবে। ইয়াহিয়া মনে মনে খুশী হয়েই আওয়ামী লীগের প্রস্তাব মেনে নিয়ে বলল যে, এটা শেষতঃ ভুট্টোর উপর নির্ভর করছে। ২০শে মার্চে ঢাকায় প্রেসিডেন্ট হাউজে আওয়ামী লীগ আরও বৃহত্তর পরামর্শক দল নিয়ে আলোচনা করে এবং সমঝোতার বিষয়টি সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছে বলে আওয়ামী লীগ জানায়। উল্লেখ্য যে, মুজিব-ইয়াহিয়ার আলোচনার ধারাবাহিক খতিয়ান কখনোই গণ মাধ্যমে আসেনি। তবে, মূল নেতৃত্ব থেকে মৌখিকভাবে অন্দরমহল হতে প্রকাশিত হয় বিক্ষিপ্তভাবে। উক্ত নেতাদের কেহ কেহ আজ মৃত, কেহ কেহ জীবিত আছেন।

মুজিব ও ইয়াহিয়া উভয়েই উভয়ের দুর্বলতার বিষয়গুলো ভালভাবে অবগত ছিলেন। ঢাকায় বামপন্থী ছাত্র নেতৃত্বের প্রচণ্ড চাপ ছিল মুজিবের উপর। রাজপথের আন্দোলনের ঢেউ অনেকটাই এদের নিয়ন্ত্রণে। এরা এরই মাঝে “জয়বাংলা বাহিনী” (যা পরে গণবাহিনী বা মুজিববাহিনীতে রূপান্তরিত হয়। সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করে দেয়। ১৫মার্চের দিকে ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশ পথে তল্লাসী চৌকী বসায়। শত্রুদের—পাক ফৌজ, বিহারী প্রমুখদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য। অন্যদিকে, ইয়াহিয়ার (সামরিক চক্রের) আশংকা ছিল যে, ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তাদের সামরিক শাসন অবৈধ ঘোষণা করে বিচারের সম্মুখীন হতে হয় কিনা--। কিন্তু, মুজিবের প্রস্তাব অনুসারে, তার আশংকা দূর হওয়ার কথা, কেননা কেন্দ্রে ইয়াহিয়া স্বয়ং প্রেসিডেন্ট থাকতে পারবে। যাক, জুলফিকার আলী ভুট্টো এ ধারণা বাতিল করে এবং শেখ মুজিবের এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।

তবে, এ পয়েন্টে, মুজিবের দীর্ঘদিনের অনুজ ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক লেখক জনাব এম আর আক্তার মুকুল লিখেছেন- “কয়েকটি বিরাট প্রশ্ন থেকে যায় যে, মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠকে ‘কিছুটা সমঝোতা’ সৃষ্টি হয়েছিল। পুরো ব্যাপারটি আবার ভিন্ন পথে প্রবাহিত হল কেন? কিছুটা ‘সমঝোতা’ করতে যেয়ে আওয়ামী লীগ কী ৬দফা থেকে সরে এসেছিল?” অন্যদিকে, ২রা এপ্রিল ১৯৭১সনের লাহোরের মার্কিন কন্‌স্যুলারের গোপন আভ্যন্তরীন রিপোর্ট মিয়া মমতাজ উদ্দিন দৌলতানার (কাউন্সিল মুসলিম লীগ প্রধান) সাথে তাঁর বাসায় বৈঠকের বিবরণে জানায় যে, মুজিব ঢাকায় ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনায় ৬দফার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিস্তারিত ততটা চাপাচাপি করেন নি। বরং মুজিব ১৯৬২ সনের সংবিধান অনুযায়ী কেন্দ্র-প্রদেশের অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষমতাবন্টন ব্যবস্থাই কার্যতঃ মেনে নেন। অর্থাৎ, কেন্দ্রে ইয়াহিয়া থাকবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে আপাততঃ আওয়ামী লীগ পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর আগে যখন দৌলতানা ঢাকার ৩২নং বাড়িতে মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করেন, তখন তিনি বলেন যে, পশ্চিম পাকিস্তানে অন্ততঃ ৪০(চল্লিশ)জন প্রতিনিধিকে পাবেন, যারা কেন্দ্রে মুজিবকে সরকার গঠনে সহযোগিতা করবে। কিন্তু মুজিব কিছুতেই বিশ্বাস করেন নি যে, পাঞ্জাবীরা সারা পাকিস্তান শাসন করতে বাঙালিদের সহ্য করবে। উক্ত রিপোর্টে( TO: SECRETARY OF STATE; WASHINGTON DC / FR: AMCONSUL, LAHORE, APRIL 12, 1971 / SUBJECT: DAULATAN’S COMMENT ON CRISIS / REF: LAHORE-515.) ফারল্যান্ড উল্লেখ করেন যে, দৌলতানা নাকি ঢাকায় মুজিবের সাথে একান্ত সাক্ষাতে এমনও জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, মুজিব পূর্ব পাকিস্তান আলাদা করতে চান কি-না। মুজিব নাকি উত্তর দেন যে, তার উপর স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য প্রচণ্ড চাপ থাকা স্বত্বেও পাকিস্তানের ঐক্য নষ্ট করতে উদ্যত হবেন না। দৌলতানা মার্কিন কন্‌স্যুলারের সাথে আলাপে আরও উল্লেখ করেন যে, মুজিবের উদ্দেশ্য ছিল যে, পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ কর্তৃত্ব গ্রহণ করে পশ্চিমাংশের সাথে সম অধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানের “কন্‌ফেডারেশন” ব্যবস্থা কায়েম করা। ২০১৩ এর ২৬শে মার্চ দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত “গোপন মার্কিন দলিল” শিরোনামে লিখিত এক প্রবন্ধে সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান উল্লেখ করেন যে, মার্কিন কূটনৈতিক ক্রেইগ ব্যাক্সটারের কাছে ৩রা মার্চ ১৯৭১সনে ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে পলিটিক্যাল কাউন্সিলার হিসাবে কর্মরত অফিসার শাহ এস এম কিবরিয়া (সাবেক অর্থমন্ত্রী) এক মধ্যাহ্ন ভোজসভায় বলেছিলেন যে, ঢাকায় স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ত ৭ই মার্চের আগেই আসতে পারে, এ জন্য জনগণ হয়ত প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে-----। কিবরিয়া আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, মুজিব এতে ইতস্তত করবেন এবং ফলে তিনি “বাম চরমপন্থীদের” হাতে তাঁর নেতৃত্ব হারাবেন। “চরমপন্থীরা” জনতাকে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে কাজে লাগাবে। যা_ই হোক—এ বিবরণ হতেও বুঝায়, তখন সরাসরি স্বাধীনতা কর্মসূচী ঘোষণা দিতে মুজিব ইতস্ততঃ হয়ত ছিলেন। এবং বাম জাতীয়তাবাদীরা কতটা শক্তিশালী ও লড়াকু তৎপর ছিল—তা বুঝতে অসুবিধা হবার নয়। বলাই বাহুল্য যে, ২রা মার্চ ছাত্রলীগ ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের নয়া পতাকা বিশাল ছাত্র গণজমায়েতের সামনে উড্ডয়ন করা হয়। পরদিন অর্থাৎ ৩রা মার্চ পল্টনে ছাত্রলীগ-শ্রমিকলীগের জনসভায় ছাত্রলীগের পক্ষ হতে বিশাল জনসভায় “স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র” প্রকাশ করা হয়। নয়া পতাকা উত্তোলন করা হয়। উপস্থিত প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু সে সময় স্বাধীনতা ঘোষণা বিষয়ে সরাসরি কিছু না বলে ভাষণে উল্লেখ করেন যে, “চূড়ান্ত মুক্তি” অর্জন না করা পর্যন্ত আন্দোলন—অহিংস অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যেতে। মনে রাখা দরকার যে, এর আগেই- অর্থাৎ ১৯৭০ সনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরপরই পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় বর্ধিত সভায়—যা নিউমার্কেট এলাকায় বলাকা ভবনে অনুষ্ঠিত হয়- নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে ছাত্রলীগ দ্বি-বিভক্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল। আ স ম রব-শাহজাহান সিরাজ-স্বপন চৌধুরী সহ অহিকাংশ নির্বাচন বর্জনের পক্ষে অবস্থান নেয়। পরে বঙ্গবন্ধুর পরামর্শে কৌশলগতভাবে শেষতঃ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত হয়। সবচেয়ে বড় সংবাদ হল, দেশে সর্বপ্রথম ছাত্রলীগই তখন আনুষ্ঠানিক ভাবে উক্ত বর্ধিত সভায় “স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। তখন ছাত্রলীগের এসব কার্যকলাপে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দৃশ্যতঃ বিব্রত, দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ, বিভ্রান্ত হয়। ছাত্রলীগের সাথে সম্পর্কটা পূর্ব হতেই ঠাণ্ডা ছিল, তখন সেটা আরও ঠাণ্ডা হয়। তৎকালীন প্রচার সম্পাদক স্বপন কুমার চৌধুরী ছিলেন উক্ত স্বাধীনতার প্রস্তাবক। তিনি চট্টগ্রামে রহস্যজনকভাবে শহরটি শত্রুমুক্ত হওয়ার এক দিন পর গুম/নিহত হন।

স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে অতীতে অনেকেই একাধিকবার বলেছেন, উদ্যোগ নিয়েছিলেন; কিন্তু তেমন কাজ হয়নি। ছাত্রলীগই সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক সরাসরি লক্ষ্যভেদী কার্যকর কর্মসূচী নিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলন সংগ্রাম—শেষতঃ যুদ্ধের সূচনা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও চিন্তা করেছিলেন একসময়। ১৯৬২সনে কোন এক রাতের অন্ধকারে কুমিল্লা জেলার সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলায় গিয়েছিলেন এ উদ্দেশ্যে ভারতীয় সহযোগিতা লাভের বিষয়ে আলোচনা করার জন্য- দিল্লীর কর্তৃপক্ষের সাথে। (আহমেদ হোসেইন, প্রবন্ধ ডেইলি স্টার-এর উইকেন্ড ম্যাগাজিন; ভলিউম-৮, ইস্যু ৯৮ ডিসেম্বর ২০০৯।) লেখক আহমেদ হোসেইন তার প্রবন্ধে বলেন, বঙ্গবন্ধু সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে আটক হন। স্থানীয় পুলিশ ষ্টেশনে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর মূল উদ্দেশ্য বর্ণনা করার পর টেলিফোনে সংশ্লিষ্ট জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের সাথে আলাপ করেন। বলেন যে, আগরতলায় একটি উড়োজাহাজ তাঁর জন্য অপেক্ষা করার কথা, যা দিয়ে দিল্লি যাবেন। আগরতলার ম্যাজিষ্ট্রেট বলেন, তার হাতে এ বিষয়ে আগাম কোন আদেশ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নেই। তাই, মুজিবকে আবার পুলিশ প্রহরায় সীমান্তে ফেরত পাঠানো হয়—এবং তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন। মুজিব তখন চেয়েছিলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী, ইপিআর ইত্যাদিতে যেসব বাঙালি চাকুরী করেন- তাদের নিয়ে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের নাগপাশ হতে মাতৃভূমিকে মুক্ত করবেন। যাক, উক্ত ঘটনার প্রায় ছয় বছর পর, ১৯৬৮সনে আউব খান শেখ মুজিবসহ মোট ৩৫জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলা—আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা—দায়ের করে তাঁকে জেলে পুড়ে। বঙ্গবন্ধুর এ ঘটনা প্রাক্তন ছাত্রলীগ নেতা ডাকসুর সাবেক সাঃ সম্পাদক আঃ কুদ্দুস মাখনও বলেছেন। (সূত্রঃ লেখক আতিকুর রহমানের প্রবন্ধ। শহিদুল ইসলাম মিন্টুর সংকলিত গ্রন্থ “শতাব্দীর মহানায়ক বঙ্গবন্ধু”, শিখা প্রকাশনী, ঢাকা।) জনাব মাখন বলেন, বঙ্গবন্ধু আগরতলা গিয়ে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার লক্ষ্যে ভারতীয় সাহায্যের জন্য বৈঠক করেছিলেন—এটা মিথ্যা নয়।

সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, বাঙালিদের মুক্তি ও স্বাধীনতার বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না। এজন্য তাঁর লক্ষ্য ১৯৬২সন সময়কাল থেকেই ছিল। প্রশ্নটি হলঃ তিনি এলক্ষ্য অর্জনে কোন পথে কোন কৌশলে এগুতে চেয়েছিলেন? প্রথমতঃ শুরুতে তিনি সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ লক্ষ্যে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু—পরবর্তীকালে তাঁর নীতি পরিবর্তন করেন। তিনি সম্পূর্ণভাবে শাসনতান্ত্রিক রাজনৈতিক লাইনের উপর নীতিগতভাবে রাজনৈতিক সংগ্রাম চালান। তিনি অহিংসবাদী হয়ে দাঁড়ান। ১৯৬২-এর পরে কখনো তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়ে সাহায্যের কথা ভেবেছেন বলে জানা যায়নি, প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাজউদ্দিন সাহেব একাধিকবার ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনারের কার্যালয়ে যান ভারতের সহযোগিতা প্রাপ্তি প্রত্যাশায় ১৯৭১ এর মার্চের প্রথমার্ধে ও শেষার্ধে, অপরীক্ষিত সূত্রে জানা যায়। তবে বঙ্গবন্ধুর এতে সম্মতি বা পরামর্শ ছিল কি-না তা জানা যায়নি। তবে হাইকমিশনার স্বাধীনতার বিষয়ে তেমন উৎসাহব্যঞ্জক আশ্বাস দেয় নি জনাব তাজউদ্দিন সাহেবকে। এর আগে ৭মার্চ মার্কিন দূত ফারল্যান্ড ধানমন্ডির ৩২নম্বরে এসে বঙ্গবন্ধুর সাথে একান্ত সাক্ষাতে, মুজিবের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র তেমন সায় দেবে না বলে মার্কিন প্রশাসনের নীতির কথা জানিয়েছিল। এসব প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু তাঁর আগের শাসনতান্ত্রিক রাজনৈতিক লাইনেই অটল থাকেন। পাকিস্তানের দু’অংশের সমন্বয়ে ‘কন্‌ফেডারেশন’ গঠনের প্রস্তাবের আলোকে ইয়াহিয়ার সাথে সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতায় যেতে চেয়েছিলেন।

১৯৭১এর ২২শে মার্চ শেখ ফজলুল হক মনি, যিনি ‘স্বাধীনবাংলা বিপ্লবী ফোরামে’র অন্যতম সদস্য ছিলেন, সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে এসে সংবাদ ফাটালেন যে, আওয়ামী লীগ ভুট্টোর সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। পরদিন ২৩শে মার্চ পাকিস্তান দিবস পালনের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ দিবস’ পালনের প্রস্তুতি পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিলেন ‘বিপ্লবী ফোরামে’র সদস্যবৃন্দ সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, আ স ম রব, স্বপন কুমার চৌধুরী, হাসানুল হক ইনু, আরিফ আহমেদ, মার্শাল মনি(মনিরুল ইসলাম মনি) প্রমুখ। উক্ত হলের ১১৬নং এবং ১১৮নং যেখানে তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম রব থাকতেন। অঘোষিত ভাবে অনেক স্থানের মত ঐ রুমগুলোও ‘বিপ্লবী ফোরামে’র ঘাঁটি ছিল। উক্ত কোয়ালিশনের সংবাদ শুনে ঘন্টা কয়েক পর শেখ মনি, রাজ্জাক ভাই, রব ভাই সহ কয়েকজন ৩২নং বাড়িতে দল বেধে গেলেন। রাত তখন প্রায় দেড়টা। লেখক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আতিকুর রহমানের বিবরনানুসারে, “বঙ্গবন্ধু তখন স্ত্রীর সাথে কথা বলছেন; বেগম মুজিব পান খাচ্ছেন। মুজিব নিজ থেকেই বললেন, শুধু জনগণের সমর্থন থাকলেই এই মুহূর্তে স্বাধীনতা আসবে না। প্রয়োজন অস্ত্রের, প্রয়োজন বিশ্বের সমর্থনের। বৃটেন, আমেরিকা, জার্মান, চীন কেহই পাকিস্তান ভাঙ্গতে চায় না। ভাষানীও চায় না। ভারতও রাজী হবে না। ছাত্র যুবনেতাদের সাথে তখন আলাপের কিছুক্ষণ পর চিন্তিত মনে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকেন।”

৩২নং থেকে বের হয়ে জহুরুল হক হলে গিয়ে ছাত্রনেতারা পরিকল্পনা করেন, যেভাবেই হোক পাকিস্তানের কাঠামোতে মুজিবের ক্ষমতা অংশগ্রহণের পরিকল্পনাকে বানচাল করতে হবে। স্যাবোটাজ করতে হবে। স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের (ছাত্র যুবনেতাদের) আহ্বানে পাকিস্তানের পতাকার বদলে সারা বাংলায় বাংলাদেশের নয়া পতাকা উত্তোলন করা হয়। জিন্নাহ্‌র ছবি নামিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙ্গানো হয়। সর্বত্র—সরকারী বেসরকারী স্থাপনায় প্রতিটি সিনেমা হলে। ২৩শে মার্চ ১৯৭১সনে।

অন্যদিকে, পাক সামরিক জান্তা বাঙালিদের উপর সম্ভাব্য আক্রমণের প্রস্তুতি চালাচ্ছে জোরগতিতে। বাঙালি সেনাদের নিরস্ত্র করা হচ্ছিল। পরদিন ২৪শে মার্চ রংপুর, সৈয়দপুর, জয়দেবপুর, যশোরে সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা শুরু করে। পত্রিকার হিসাবে প্রায় ১৫০জনের মত। পাক সেনাদের মদদে বিহারী লুটতরাজ শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর ৩২নং বাড়িতেও সেনা অভিযান চলবে। তাঁকে আগেই তাঁর নিজস্ব সংবাদদাতারা একাধিকবার অবগত করেন। তারপরও সেই সংকটময় সময়কালে দিকদর্শনহারা বিদ্রোহী বাঙালিদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও সুদূরপ্রসারী কর্মসূচী সিদ্ধান্ত দিতে বঙ্গবন্ধু অপারগতা প্রমাণ/প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর শাসনতান্ত্রিক নিয়মতান্ত্রিক লাইনেই অবস্থান করেন। ২৫শে মার্চ বিকালে সংবাদপত্রে বিবৃতি পাঠালেন, দেশবাসীকে ২৭মার্চ ১৯৭১ সারা দেশে হরতাল পালনের আহ্বান জানান। যদিও সেদিন আর নির্দেশ হতে হরতাল পালন করতে হয় নি। ঐ দিন রাতে পাকি ফৌজদের গণহত্যায় পুরো দেশ শোক-সন্ত্রস্থ হল। ২৫শে মার্চ বিকালে বঙ্গবন্ধু আরেকটি বিবৃতিতে বাঙালিদের আহ্বান জানান যে, ম্যানিলা (ফিলিপিন)-এর মাধ্যমে যেন পাট রপ্তানী ও আন্তর্জাতিক টেলিফোন লাইন অব্যাহত রেখে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসা-বাণিজ্য অর্থনীতি সচল রাখেন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্র (২৬ মার্চ ১৯৭১) এসব সংবাদ প্রকাশিত হয়। হংকংস্থ ইউ পি আই (UPI) সংবাদদাতা রবার্ট কেইলর যিনি বিশেষ এসাইনমেন্টে ঢাকায় হোটেল ইন্টারকনে অবস্থান করছিলেন, মার্চের শেষ দিনগুলোর বিশেষতঃ ২৪মার্চ ও ২৫শে মার্চের ঘটনাবলীর ধারাবাহিক রিপোর্ট বিশেষ কৌশলে সেনাচক্ষু ফাঁকি দিয়ে হংকং পৌঁছে তার সংস্থায় প্রকাশ করেন ২৯শে মার্চ ১৯৭১। তাতে উপরুক্ত তথ্যাবলী উল্লেখিত আছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পাক ফৌজ ঢাকায় ২৫শে মার্চ রাত ১০টার দিকেই গণহত্যা শুরু করে; রেডিও, টিভি, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ কেন্দ্র ইত্যাদির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি পরিষ্কার অনুধাবনের উদ্দেশে এমন কি আরও স্মরণ করা যায় যে, তাজউদ্দিন সাহেব ২৫শে মার্চ রাতেও শেষ বারের মত আবারও কাগজ-কলম নিয়ে নিজ হাতে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখতে সবিস্তারে বুঝিয়ে সবিনয়ে অনুরোধ করেন বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু আবারও তা প্রত্যাখ্যান করেন বা রাজী হন নি। তাজউদ্দিন সাহেব আরও অনুরোধ করেন, ৩২নং অবিলম্বে ত্যাগ করে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য। বঙ্গবন্ধু (রহস্যজনকভাবে!) তাতেও রাজী হন নি। শেষে উপায়ন্ত না দেখে, তাজউদ্দিন সাহেব রাগ করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ত্যাগ করেন। (“মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর”- একটি নির্দলীয় ইতিহাস, লেখক গোলাম মুর্শিদ, প্রথমা প্রকাশনা, ঢাকা, ২০১০।) ডঃ কামাল হোসেন, ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ২৫শে মার্চের রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আলোচনার সমঝোতা স্মারক মুসাবিদার ও তাতে সই করার সংবাদ সম্বলিত ফোনের অপেক্ষায় ছিলেন, যা কখনো আর আসেনি। তার আগে তাজউদ্দিন সাবকে বঙ্গবন্ধু বলেন, ঢাকার আশেপাশে পালিয়ে থাকতে, অন্যান্য নেতাদের সহ জেলা পর্যায়ের নেতারাও যারা তখন ঢাকায় ছিলেন তাদের গ্রামে আত্মগোপন করে থাকতে বলেন। কিন্তু – সীমান্ত পেরিয়ে ট্রেনিং ও লড়াইর কথা বলেন নি। তবে শেখ মনি, রাজ্জাকভাই, সিরাজভাই, রবভাই যখন বিকেলে শেষ দেখা করেন, তাদের “লড়াই” চালিয়ে যেতে বলেন। বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় যে, দু’গ্রুপের দুই লাইনের নেতাদের দুই ধরণের উপদেশ দিলেন। এবং নিজে, ৬ই মার্চে যেমনটি পাক বাহিনী তাকে গ্রেফতার করার আবেদন করেছিলেন (এম আর আক্তার মুকুল), প্রায় তেমনি বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাতেও স্বেচ্ছা গ্রেফতার বরণের কৌশলের আশ্রয় নেন। বিষয়টি বিশ্লেষণের দাবী রাখে।

ভারতের সাহায্য, বা ভারতে আশ্রয় নিয়ে সাহায্য নিয়ে তাৎক্ষনিক স্বাধীনতার সংগ্রামের বিষয়টি সে পরিবেশে বঙ্গবন্ধু ভাবতেই পারেন নি—এটা ভালই বুঝা যায়। “রক্ত গরম” বাম জাতীয়তাবাদী ছাত্রযুব কর্মীগণ কোন ট্রেনিং অস্ত্র বিদেশী(পাশ্চাত্য) শক্তিদের সক্রিয় সমর্থন ছাড়া দুধর্ষ সুশৃংখল পাক ফৌজের সামনে লড়াইয়ে কতটুকু ঠিকতে পারবে—তা অনুমেয়। (বেশি দিন টিকবে না।) কয়েক সপ্তাহের, বা মাস কয়েকের পরে বাম ছাত্রদের শক্তি কমে গেলে, তার উপর চাপ কমলে, বঙ্গবন্ধু স্বচ্ছন্দ মত শাসনতান্ত্রিক সমঝোতায় যেভাবে হোক পৌছাবেন, বা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায়-সহায়তায় একটি সুরাহায় পৌঁছতে পারবেন। দেশে অন্ততঃ মৌলানা ভাষানীর (সাবেক রাজনৈতিক গুরু) সমর্থন পাবেন বা আদায় করতে পারবেন, নিজের লাইনে লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। বঙ্গবন্ধুর এমন কোন কৌশলের কথা ভেবেছিলেন কি-না ইতিহাসবিদ গবেষকদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা উচিত।

শাসনতান্ত্রিক লাইনের দৃষ্টিতে হয়ত বঙ্গবন্ধু সঠিক অবস্থানেই ছিলেন ১৯৭১এর মার্চের দিনগুলোয়। অর্থাৎ স্বায়ত্বশাসনের প্রশ্নে। বাংলার স্বাধীনতার স্তরে আন্দোলনকে তিনি অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে উত্তরণের কথা ভেবেছিলেন—তা তাঁর কার্যধারা হতে বোধগম্য। তাৎক্ষনিক বিপ্লবাত্মক সশস্ত্র যুদ্ধের চিন্তা পরিকল্পনা করেন নি। ১৯৭০এর নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগের মূল নেতৃত্ব যখন নির্বাচন বর্জন করে “জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের” দিকে যাচ্ছিল, তখন বঙ্গবন্ধু তাদেরকে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে স্বাধীনতার পদক্ষেপ নিবেন বলে বুঝিয়ে তাদের নির্বাচনের পথে ফিরিয়ে এনেছিলেন। এটা আনুষ্ঠানিক/প্রাতিষ্ঠানিক কোন তথ্য নয়, মঞ্চের নেপথ্যের তথ্য। বঙ্গবন্ধুর সেই আশ্বাসের উপর ভিত্তি করেই ছাত্রলীগ নির্বাচনের সময় গ্রামে-গঞ্জে ৬দফা/ স্বায়ত্বশাসনের বিষয়াবলীই শুধু প্রচার করে নি; উপরন্ত জাতীয় মুক্তি, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, শ্রেণিসংগ্রাম, রাশিয়া-চীন-ভিয়েতনাম-কিউবার লাইনও প্রচার করে। ১৯৭০ এর নির্বাচন হল। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ একচেটিয়া রায় পেল। ফলে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী ঘোষণা ৬দফা বিশেষতঃ স্বায়ত্বশাসনের বিষয়ের উপর দৃঢ়ভাবে সরকার—(কেন্দ্রে না হলেও প্রাদেশিক ঢাকায়)- গঠনের লক্ষ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। ২৩শে মার্চ ভোরে গভীর রাতে (দেড়টার দিকে) মনিভাই, রাজ্জাকভাই, সিরাজভাই সহ ছাত্রনেতাদের বুঝালেন—প্রাদেশিক সরকার আওয়ামী লীগ গঠন করতে পারলে, বাঙালিরা অস্ত্র, ট্রেনিং, বিদেশী সমর্থন ইত্যাদি বৃদ্ধি করে তিন/চার মাস পর স্বাধীনতার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা যাবে।

যুবনেতারা বিশ্লেষণ করে দেখলেন যে, মার্চে যে বিপ্লবী পরিস্থিত ঢাকায় বিরাজ করছিল—যা স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য অনুকূল ছিল—তিন/চার মাস পর অনুরূপ পরিস্থিতি হয়ত না-ও থাকতে পারে। পরিস্থিতি হয়ত বাঙালি রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী যারা শাসনতান্ত্রিক লাইনের এবং/অথবা পাঞ্জাবী সামরিক চক্রের অনুকূলেও পরিবর্তিত হতে পারে। যুবনেতারা নিজের সশস্ত্র লাইনেই অটল থাকেন। পরিকল্পনা—সরাসরি সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতি ও বেগবান করা। ২৩শে মার্চ যুবনেতারা মিছিল করে এসে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে বাংলাদেশের নয়া পতাকা উত্তোলন করে। ২৪মার্চ ৩২নং সড়কের আশেপাশে ব্যারিকেড নির্মাণ করে—যাতে সেনাবাহিনী তাঁর বাড়িতে সহজে প্রবেশ করতে না পারে। বঙ্গবন্ধু “বোধগম্য” কারণেই মুখ খোলে যুবনেতাদের এসব বিষয়ে “না” বলতে পারেন নি; বা বিরত রাখতে চেষ্টা করেন নি। বাম যুবনেতাদের উদ্দেশ্য হল—বঙ্গবন্ধুকে শত্রুদের সাথে সমঝোতার লাইন বানচাল করা; তাঁর শাসনতান্ত্রিক লাইন অকার্যকর করা, বাঙালিদের সশস্ত্র লড়াইয়ের বলয়ে টেনে আনা।

অন্যান্যের মত একজন মানুষ হিসাবে, রাজনীতিবিদ হিসাবে বঙ্গবন্ধুও সৎ সমালোচনার উর্ধ্বে নয় অবশ্যি। ভুল-ত্রুটি সীমাবদ্ধতা তাঁরও ছিল। যে নেতা তাঁর যৌবনে কঠোর পরিশ্রম করে ছাত্র-যুব কর্মী হিসাবে মুসলী লীগের সদস্য হিসাবে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন—সে নেতা—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে কি অবদান রেখেছেন—ঐ সব সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখেই তা মূল্যায়ন করতে হবে। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আন্দোলন, ৬দফা স্বাধীকার-স্বায়ত্বশাসন আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে পরিপক্ষ করেছিলেন এমন স্তর পর্যন্ত যেখানে বাঙালিরা নিজের স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্রের চিন্তা-স্বপ্ন দেখতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি রচনা, তার উপর চার দেয়াল নির্মাণ করেছেন ছাত্র-যুব-শ্রমিক-কৃষকদের নিয়ে। স্বাধীনতার সৌধের ছাদ নির্মাণের সময়—নয় মাসের যুদ্ধে—ছাত্রযুব কৃষকশ্রমিকদের সাথে থাকেন নি/থাকতে পারেন নি।

২৬শে মার্চ বিদ্রোহী বাঙালিরা হতভম্ব হল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হল। স্বাধীনতা সংগ্রামের দিক নির্দেশনা নেই। রোড ম্যাপ নেই। পরিকল্পনা নেই। স্বেচ্ছাসেবকবাহিনী (রাজ্জাক ভাইর) ও জয়বাংলা বাহিনী (পল্টু ও খসরু ভাই) মার্চের মাঝামাঝি হতেই সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে আসছিল। তাঁরাও ২৬মার্চ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। হাল ধরেন তাজউদ্দিন সাহেব ও ছাত্রনেতারা।

মন্ট্রিয়েল, ১৩মে ২০১৩।

(লেখক আব্দুল কাদের চৌধুরী রাজনীতি, সমাজতাত্বিক বিশ্লেষক।)