ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিচিতির হাতিয়ারঃ হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-বিহারী ও বাঙালি-বাংলাদেশি
Nur Kazi, বুধবার, আগস্ট ১৪, ২০১৩


ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিচিতির হাতিয়ারঃ হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-বিহারী ও বাঙালি-বাংলাদেশি

নূর মোহাম্মদ কাজী

আমাদের পুর্বপুরুষরা স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে নানা প্রকারের পরিচিতি প্রত্যয় (Identity concepts) ব্যবহার করেছেন। যার মধ্যে ধর্মীয় পরিচিতি, এথনিক পরিচিতি ও স্থানিক পরিচিতি রয়েছে। ধর্মীয় পরিচিতিতে আমরা কেহ মুসলমান, কেহ হিন্দু, কেহ বৌদ্ধ, আবার কেহ বা খৃষ্টান। আর এথনিক পরিচিতিতে আমরা ছিলাম বাঙালি, বিহারী, পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধী, বালুচ, অহমিয়া, টিপরা, মণিপুরী, নাগা, মিজো, চাকমা, মারমা কিম্বা সাঁওতাল। এবং স্থানিক পরিচিতি মার্কার ব্যবহার করার পর আমরা কেহ হলাম বাঙালি, আবার কেহ হলাম বাংলাদেশি (বিহারী, বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠী ও এথনিক জাতি-গোষ্টীর সন্বয়মূলক)। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির গতিপথ নির্ধারনে এ তিন ধরনের পরিচিতি নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।

হিন্দু-মুসলমান,
হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা ছিলেন বাবু বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শ্রী অরবিন্দু বোস। শ্রী বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৮২ সালে আনন্দ মঠ উপন্যাস লিখে হিন্দু জাতীয়তাবাদের রোডম্যাপ আকেন। এ গ্রন্থে তিনি মুসলমানদের “যবন” নাম দিয়ে কল্পনার পক্ষ-প্রতিপক্ষ মিথ নির্মান করেন। হিন্দুদের প্রতিপক্ষ মুসলমান এ মিথ্যা মিথ আজও অব্যাহত রয়েছে। বাঙালি মুসলমান ও এদেশের আধিবাসীদের অধীনস্থ করে রাখার লক্ষ্যে এ মিথ্যা মিথকে অব্যাহত রাখা অতি প্রয়োজন। বর্নব্যবস্থা ভিত্তিক হিন্দু জাতীয়তাবাদের নির্মান কাজ আজও অব্যাহত রয়েছে। শ্রী বংকিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হিন্দু জাতীয় জাগরনের সংগীত “বন্দে মাতরম” রচনা করেন এবং এ সংগীতে তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদের ঐক্যের প্রতীক নির্ধারন করেন। আর শ্রী অরবিন্দু বোস হিন্দু জাতীয়তাবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মান করেন। এ দু’জন পন্ডিতের শুরু করা “হিন্দু জাতীয়তাবাদী” ধারনাকে প্রকৃতির সাথে সাদৃশ্যমুলক ঐক্যসূত্র (Principle of uniformity of nature) নির্মানের কাজ করেছেন কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি তার পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রবর্তিত ব্রাম্ম মতবাদের ধারাবাহিকতায় হিন্দু জাতীয়তাবাদে সাদৃশ্য মুলক যুক্তি বিন্যস্থ করার প্রয়াস চালান। তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থ “গীতাঞ্জলী”র গানগুলু একেশ্বরবাদী মতবাদে পুষ্ঠ। এ কাব্য গ্রন্থের জন্য তিনি পশ্চিমা একেশ্বরবাদী সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানিত পুরষ্কার-নভেল পুরষ্কার পান। বাংলাভাষায় রচিত কবিগুরুর এ গ্রন্থ একেশ্বরবাদের প্রশংসা গ্রন্থ। হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভুবনচিন্তা নির্মানে এ গ্রন্থ কি ভুমিকা রেখেছে তার বিস্তারিত আলোচনা আজও হয়নি।
এ প্রেক্ষাপটে ১৯০৫ সাল থেকে ভারতের পুর্বাঞ্চলে বাঙ্গালি মুসলমানের মধ্যে নবজাগরন দেখা দেয়। এ সময় বৃটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন পুর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে পৃথক প্রশাসনিক প্রদেশ ঘোষণা দিয়েছিলেন। লক্ষ্য ছিল একটি মুসলিম মেজোরিটি প্রদেশ গঠন। এ ঘোষনার মাধ্যমে লর্ড কার্জনই মূলতঃ বাঙালি মুসলিম পরিচিতিকে সামনে নিয়ে আসেন। বর্ণ হিন্দু সম্প্রদায় এর প্রবল বিরোধীতা শুরু করেন। এ প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ সালে ভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে অল ইণ্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ঢাকায় আগত মুসলিম নেতৃবৃন্দের এক ঐতিহাসিক সভায় এ পার্টী গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। মূলত ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এ সভার আয়োজন করেন। এখান থেকেই “বাঙালি মুসলমান” নিজ ধর্মীয় পরিচিতির পাটাতন ব্যবহার শুরু করে। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ক্ষমতার রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচিতি দ্বন্দ্ব-বিরোধের মূলকেন্দ্র তৈরী হ্য়। এ দ্বন্দ্ব-বিরোধের রাজনীতির ভিত্তিতেই হিন্দু ও মুসলমান জাতির জন্য পৃথক পৃথক ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৪৭ সালে ভারত পাকিস্তান বিভাজনের প্রাক্কালে বাঙালি মুসলিম নেতৃবৃন্দ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ বাঙালি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জোর প্রচেষ্টা চালান। এ সময় হিন্দু নেতৃত্বাধীন বাংলা কংগ্রেস ও বাংলার কমিউনিষ্ট পার্টি এ উদ্যেগের বিপক্ষ্যে দাঁড়ায়। এবং এই বলে হুমকি দেন যে, তারা বাংলা বিভাজন ছাড়া কিছুতেই ভারত বিভাজন মেনে নেবেন না। তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বাঙালি রাষ্ট্র নয়, বরং হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক বৃহত্ ভারত রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকেই গ্রহন করেছিলেন। ইতিহাস প্রমাণ করে যে, বাঙালি হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়ভুক্ত মুসলিম জাতীয়তাবাদী মাত্রই বাঙালি মুসলিম জাতীয়তাবাদের ঘোর বিরোধী। এ হিন্দিবলয়ভুক্ত হিন্দু ও মুসলমানরা নিজেদের অগ্রগতির স্বার্থেই সর্বভারতীয় জাতীয়তাবাদের পক্ষ্যে কাজ করছে। এ সর্বভারতীয় চেতনার পক্ষ্যে কাজ করার জন্য গড়ে উঠেছে জামাতে ইসলামী-হিন্দ, ওলামায়ে হিন্দ (দেওবন্দী) ও তাবলীগ জামাত।
বাঙালি-বিহারী
১৯৭১ সালে এথনিক পরিচিতি-বাঙালি-বিহারী রাজনীতির পরস্পর বিরোধী প্লাটফরম গড়ে উঠার কারনে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৪৭ সালের উষালগ্ন থেকে বাঙালি-বিহারী বিরোধের সুচনা হয়। কারন যে স্বপ্ন দেখে বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তার ফসল বাঙালি মুসলমানের ঘরে উঠল না। বাঙালি মুসলমানদের ধর্মীয় সারল্যের সু্যোগ নিয়ে বাহির থেকে আগত এথনিক বিহারী মুসলমানরা পাকিস্তানী স্বাধীনতার ফসল নিজেদের ঘরে তোলা শুরু করলো। বাংলাদেশের শহরগুলু দখল করলো তারা। আর গ্রামের লড়াকু বাঙালি মুসলমান গ্রামেই রয়ে গেল। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের বাঙালি জাগরনের নির্বাচন, ১৯৬৯ সালের গনঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের বাঙালি জাতির ঐক্যভিত্তি প্রতিষ্ঠার নির্বাচন, ১৯৭০-৭১ সালে বাঙালি-বিহারী সংঘাত ও সর্বশেষ ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতির বাঁচা-মরার যুদ্ধ- জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিলো।
এ যুদ্ধ কার সাথে কার যুদ্ধ ছিল? যুদ্ধ ছিল বাহির থেকে আগত পাকিস্তানপন্থী এথনিক জাতি-গোষ্ঠী-বিহারী, পাঞ্জাবী, পাঠান, বালুচদের সাথে বাঙালি জাতির যুদ্ধ। এ যুদ্ধে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি জাতি স্ব-রাষ্ট্র বাংলাদেশ অর্জন করে।
বাঙালি-বাংলাদেশি
১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাঙালি ও বাংলাদেশি (বিহারী, বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠী ও এথনিক জাতি-গোষ্টীর সন্বয়মূলক) পরিচিতির বিভাজন আসে। ভূ-রাজনীতির চাপে পড়ে তত্কালীন সামরিক শাসকরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের তাত্বিক ভিত্তি আমদানী করেন।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নাম করে এক দল লোক বাঙালি জাতির অতীতের সকল অর্জনকে কালের অতলগহব্বরে নিক্ষেপ করতে চায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে এরা অতীতের ইতিহাস বলে গুরুত্বহীন করে তুলতে চায়। এরা মনে করেন বাংলাদেশের ইতিহাসের স্বর্ণ যুগের সূচনা হয়েছে ১৯৭৫ সালের পর থেকে। ইদানিং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে কেহ কেহ অতীতকে বাদ দিয়ে রাজনীতি করার উপর গুরুত্ব আরোপ করছেন। অতীতকে মুছে দিয়ে কেবল ভবিষ্যতকে নিয়েই এরা রাজনীতি করবেন, এরা এমন কথাও বলছেন। এরা হাজার বছর ধরে চলমান বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের রক্ত-রঞ্জিত ইতিহাসকে মুছে দিতে চান। ধর্ম রাজনীতিকে ধারন করে এরা ধর্মের ইতিহাস, উত্পাদনের নাম করে এরা উত্পাদন সম্পর্কের ইতিহাস, এবং জন্ম-বিজ্ঞানের ( Genealogy) ভিত্তিমূলে দাঁড়িয়ে এরা জন্ম দাঁতার কৃতিত্ত্বের ইতিহাস ভুলে যেতে চান।
অপরদিকে আরেক দল বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে এক নদী রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাঙালি জাতির মৌলিক অর্জনকেই আজ প্রশ্ন বিদ্ধ করে তুলেছে। দেশ ও জাতিকে এরা পৈত্রিক সম্পত্তিতে পরিনত করতে প্রয়াস চালাচ্ছেন। এরা বাঙালি জাতির ইতিহাসে যে রাজতন্ত্রের ট্রাডিশন নেই, তা হয়তো বা জানেন না। এ কারনে এরা বাংলাদেশের স্বপ্নের ভীত নির্মাতা হক-ভাসানী-সোহরাওয়াদ্দীর নাম ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে চায়। বিগত ২২ বছর ধরে ক্ষমতাসীন দল দু’টির প্রধানগন তাদের আচরনে এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, তারা বাঙালি জাতির নন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রনেতা। এবং এ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার দাবীদার হিসেবে একজন তার বাবাকে এবং আর একজন তার স্বামীকে প্রাধান্যে আনার চেষ্টা করে আসছেন। এরা আর কাউকে ইতিহাসে স্থান দিতে চান না। এরা আর কোথাও না হউক কেবল ভারতের দিকে তাকিয়েও আমাদের জাতীয় নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারতেন। আমাদের মহান জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীর প্রতি বিগত ৪২ বছরে বাংলাদেশের কোন সরকার প্রধান সম্মান দেখান নাই ও তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে কিছু করেন নাই। ভারতে মহাত্মা গান্ধীর গৌরব গাঁথা তুলে ধরেছিলেন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। মওলানা ভাসানীকে যদি কেউ পিতৃতুল্য ইজ্জত দিয়ে থাকেন, তা দিয়েছেন ১৯৭১ সালে মুক্তিযদ্ধ চলাকালে বাঙালি জাতির দাঁড়ের মাঝি মহামতি ইন্দিরা গান্ধী। মওলানা ভাসানী এ শ্রদ্ধা প্রাপ্তির আবেগে ভারতের কাছে বাংলাদেশকে বিকিয়ে দেন নাই। এখানেই মওলানা ভাসানীর বিরাটত্ব এবং মহামতি ইন্দিরা গান্ধীর মহত্ব। মওলানা ভাসানীকে শেখ মুজিব কদম বুঁচি করে শ্রদ্ধা জানাতেন। আমাদের দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তিগন জাতির এ নিকট অতীতের ইতিহাসও ভুলে গেছেন। জাতীয় জীবনের দুর্দিন এখানেই। যারা ইতিহাসের লিঙ্ক মুছে ফেলার চেষ্টা করেন, ইতিহাস তাদের নামও একদিন মুছে দিতে পারে। এদের করুন পরিনতির জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে এর জন্য জাতিকেও কাফফারা দিতে হবে।


পরিশেষে
২০১৩ সালে এসে এখন আমরা ধর্মীয়, এথনিক এবং স্থানিক পরিচিতির বিভ্রান্তির কবলে পড়েছি। আমরা কি ক্ষমতার রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচিতির পুরাতন পাটাতনঃ হিন্দু ও মুসলমান পরিচিতি ব্যবহার করবো? না কি বাঙালি ও বাংলাদেশি (বিহারী, বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠী ও এথনিক জাতি-গোষ্টীর সন্বয়মূলক) দ্বন্দ্ব-বিরোধের পাটাতন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাবো? এখানে “আস্তিক-নাস্তিক” রাজনীতি হলো ধর্মীয় রাজনীতির বাই-প্রোডাক্টঃ যা ক্ষমতাবান শ্রেণী চায়। এ কারনে ধর্মকে রাজনীতিতে নিয়ে আসাটা সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই জরুরী। বিভ্রান্তি এখানেই। এ বিভ্রান্তির জাল দেশের মানুষের সামনে ফেলা হয়েছে। এ জালে পড়ে বাংলাদেশের ক্ষতি হবে। বাংলাদেশের মানুষে ক্ষতি হবে। বাঙালি জাতির ক্ষতি হবে। বাঙালি জাতির জ্ঞাতি- প্রতিবেশীদেরও ক্ষতি হবে।