স্মরণ : হিমাশু শেখর ধর
আ.ফ.ম কামাল - এডভোকেট, সাবেক চেয়ারম্যান, সিলেট পৌরসভা।, সোমবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৩


স্মরণ : হিমাশু শেখর ধর
আ.ফ.ম কামাল
হিমাংশু শেখর ধর (ঝনাদা) সম্পর্কে লিখতে বসে আমার মানসপটে ভেসে ওঠছে তাঁর গৌরবর্ণ, হাস্যোজ্জ্বল, দীর্ঘ সুঠামদেহী ধোপদুরস্ত ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত চেহারাটা। তাঁর অনুজ শঙ্করদা আমাদের অনেক আগে থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে আসছিলেন। আমাদের সাথেও পরীক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সুবেশধারী অতিথিপরায়ণ; তারই নিমন্ত্রণে পূজা-পার্বণে তার বাসায় যেতাম। তিনিই ঝনাদার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর অতি ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি আমাদের খবরদারি করতেন। ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বন্ধের লক্ষ্যে শান্তি মিছিলের আয়োজন করা হয়। সেই সময় ছাত্রদের মধ্যে আমিও একজন আয়োজক ছিলাম। আমরা হিন্দু-মুসলিম তথা সুশীল সমাজের সাথে আলোচনা করতে গিয়ে সাংবাদিক ঝনাবাবুর সাথে ঘনিষ্ঠ হই। তখন তিনি সাপ্তাহিক যুগভেরীর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতেন। স্বাধীনতা উত্তরকাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি নিজ বাড়িতে সিলেট প্রিন্টার্স নামে একটা প্রেস স্থাপন করেন এবং সাপ্তাহিক সিলেটবার্তা (পরবর্তীতে দেশবার্তা) নামক একটা পত্রিকা তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশ করেন। সিলেটের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার বিকাশে পথিকৃৎদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। একজন প্রবীণ সাংবাদিক হিসেবে সিলেট প্রেসক্লাবের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। ১৯৭৩ সালে আমি সিলেট পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি, ঝনাদাও একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আমরা উভয়েই অকৃতকার্য হই। তখন থেকে তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়ে যায়। ১৯৭৭ সালে তিনি পৌরসভার কমিশনার পদে নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৮৪-তে আমি পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। তিনি কমিশনার পদে পুনঃনির্বাচিত হন। আমার পরিষদে ঝনাদা ছিলেন সর্বজ্যেষ্ঠ। অন্যরা ছিলেন আমার চেয়ে ছোট তাই ঝনাদাকে দাদা হিসাবে শ্রদ্ধা করতাম ও আমার কাজ-কর্মে তাঁর উপদেশ নিতাম। মনে পড়ে, কাষ্টঘর সুইপার কলোনি ও পার্শ্ববর্তী কালভার্ট তৈরি করার কাজের সময় আমি তাঁকে শুরু করতে বললে, তিনি বলেছিলেন ‘এ কাজ আমি করতে পারি না, কারণ আপনি আমার থেকে বয়সে ছোট হলেও পদে পৌরপিতা, তাই আপনাকেই শুরু করতে হবে।’ আমি তখন বলেছিলাম ‘আসুন আমার দু’জনে মিলেই শুরু করি।’ আমার তখনকার সময়ের প্রতিটি উন্নয়ন কাজে তিনি আমাকে উৎসাহিত করতেন। আলী আমজাদের ঘড়ি পুনঃস্থাপন, শাহজালাল ঘাট নির্মাণ, পৌরভবন নির্মাণ, শ্মশান ঘাটের উন্নয়ন প্রভৃতি কাজে তিনি আমাকে খুবই সহযোগিতা করেছেন। ১৯৮৭ সালে সিলেট পৌরসভার দায়িত্বে সিলেটে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির অষ্টম জাতীয় ইতিহাস সম্মেলন সাফল্যমন্ডিত করার জন্য তিনি যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। ঝনাদার ছেলে গৌরাঙ্গের সাথে আমার ছোট ভাই নাসিরের বন্ধুত্ব ছিল। এক পর্যায়ে গৌরাঙ্গ কানাডায় চলে যায়, যাওয়ার আগে আমার সাথে দেখা করতে এসে বলেছিল, ‘আমি যাচ্ছি, নাসিরের যাওয়ার ব্যবস্থা করব’। সত্যিই কিছুদিন পরে নাসির চলে যায় এবং পরবর্তীতে গৌরাঙ্গ তার মা-বাবাসহ অন্যদের এবং নাসির তার আম্মা অর্থাৎ আমার চাচি সহ দুই ভাই ও এক বোনকে কানাডায় নিয়ে যায়। দুই পরিবারের মধ্যে গড়ে উঠে ঘনিষ্ঠতা ও সখ্যতা। আমি যখন কানাডায় যাই নাসির তখন একাই ছিল কানাডায়। আমি তার ওখানেই ছিলাম। কানাডায় ঝনাদার বাসায় অনেকক্ষণ ছিলাম। যতক্ষণ তাঁর সাথে কথা হয়েছে, সিলেটের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির কথাই বলেছেন। এক পর্যায়ে তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘সিলেট শহরকে কি মন্ট্রিয়লের মতো করা যায় না?’ আমি বলেছিলাম ‘মন্ট্রিয়লের মতো করা যাবে না সত্যি, তবে অনেক কিছুই করা যাবে। এজন্য পৌর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা ও আন্তরিকতা থাকতে হবে, থাকতে হবে শহরবাসীর সহযোগিতা ও সহমর্মিতা।’’ ইজি চেয়ারে বসে বসে অনেক কথাই বলেছিলেন ঝনাদা। তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আমি দেশে চলে যাব এখানে থাকব না।’ পরে তিনি তাঁর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে সিলেটে আসেন। আমি তাঁকে কানাডার কথা স্মরণ করে দিয়ে এখানে থাকতে বলেছিলাম। তিনি বললেন, ‘চিকিৎসার জন্যই আমাকে চলে যেতে হবে, তবে সুস্থ হলেই ফিরে আসব।’ কিন্তু নিয়তি তাঁকে ফিরে আসতে দেয়নি। গৌরাঙ্গ ও নাসিরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমার সম্পর্ককে পাল্টে দিয়েছে। নাসির ঝনাদাকে জ্যাঠা বলে সম্বোধন করত। আমার চাচি সবাইকে কানাডায় রেখে বাংলাদেশে চলে আসেন। কিছুদিন আগে চাচি মারা যান এবং এর পরপরই ঝনাদা প্রয়াত হন। শ্রী হিমাংশু শেখর ধর ঝনাবাবুর মহাপ্রয়াণে সিলেট হারিয়েছে একজন প্রবীণ সাংবাদিক, কলামিস্ট, সমাজসেবী ও এক মহৎপ্রাণ ব্যক্তিকে যিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে একজন সাংবাদিক হিসেবে দেশের, এই অঞ্চলের ও সমাজের উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। মনে পড়ে, পৌরসভায় থাকাকালে লেখালেখির কোনো প্রসঙ্গ আসলেই ঝনাদার উপর দায়িত্ব দেয়া হত। তিনি তা অত্যন্ত সুচারুভাবে সম্পন্ন করতেন। তাঁর দরাজ কন্ঠ, ভাবগম্ভীর বক্তব্য, সুঠাম সুন্দর দেহ, বাচনভঙ্গি শ্রোতাদের আকৃষ্ট করত। সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীদের সাথে ছিল তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। সাধারণ মানুষ তথা গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি তাঁর ছিল গভীর সহানুভূতি। তাই তাঁর এলাকাবাসী জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সবাই ভোট দিয়ে তাঁকে দু-দু’বার পৌরসভার কমিশনার নির্বাচিত করেছিল। জনগণের যেমন ছিল তাঁর প্রতি দরদ তেমনই তাঁর ছিল জনগণের প্রতি মমত্ব। তাইতো বিদেশের মাটিতে থেকেও আমার সাথে আলাপচারিতায় দেশের কথা, দেশের সাধারণ মানুষের কথাই বলেছেন বেশি। চলে যাবার শর্ত দিয়েই মানুষের এ সুন্দর ধরণীতে আসা। মানব মনের চিরন্তন আর্তি ‘যেতে নাহি দেব হায়, তবু যেতে দিতে হয়।’ প্রতিদিন হাজারো মানব সন্তান জন্ম নিচ্ছে আবার হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। এটাই সৃষ্টির অমোঘ নিয়ম। নিয়তির এই নিয়মের কাছে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। ‘জন্মিলে মরিতে হবে/অমর কে কোথা কবে/চিরস্থির কবে নীর, হায়রে জীবন নদে।’ ঝনাবাবু পরিণত বয়সে সন্তানসন্ততিকে প্রতিষ্ঠিত করে সমাজ, দেশ ও জাতিকে উজাড় করে যা দিয়ে গেছেন তাতে তাঁর স্মৃতি মানুষ ভুলতে পারবে না। ঝনাদা জন্মেছিলেন ২৬ এপ্রিল ১৯১৯ সালে সিলেট শহরের কাষ্টঘরে। তার পৈতৃক নিবাস মৌলভীবাজারের রাজনগরের খলাগ্রামে। ২০০৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কানাডার মন্ট্রিয়লে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এমন মহৎ ব্যক্তির বিদেহী আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক। তাঁর সদ্গতি হোক। তাঁর তিরোধানে আমি তাঁর প্রতি আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। সর্বমঙ্গলময়ী বিশ্বনিয়ন্তা তাঁর পরিবারের সবাইকে এ মর্মান্তিক আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা দান করুন। লেখক : এডভোকেট, সাবেক চেয়ারম্যান, সিলেট পৌরসভা।