প্রবচন বিভ্রান্তিঃ কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও তমুদ্দুন
নূর মোহাম্মদ কাজী, সোমবার, ডিসেম্বর ১০, ২০১২


বাংলাদেশের প্রাত্যাহিক জীবনে আমরা “কৃষ্টি”, “সংস্কৃতি” ও “তমুদ্দুন” প্রবচন (discourse) তিনটি ব্যবহার করে থাকি। এ তিনটি প্রবচন আমাদের সমাজে তিন ধরনের সামাজিক পার্থক্য ও আইডেন্টিটি নির্মান করেছে। আইডেন্টিটিগুলুকে শনাক্ত করার জন্য আমরা নামের আগে ও পরে “সাহেব”, “বাবু” ও “শরীফ” বিশেষণ যুক্ত করে থাকি।

কৃষ্টি প্রবচনটি ফ্রেন্স ভাষার কালচার (Culture) শব্দের বংগানুবাদ। কৃষ্টিমনা বা কালচারড লোককে আমরা সাহেব বলি। এরা এদেশে বৃটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত শিক্ষা নীতির ধারাবাহিকতার ফসল। এবং ইংরেজদের মত স্যুটেড-কোটেড জেন্টেলম্যান হবার কৃষ্টি-কালচার অনুসরন করেন।

সংস্কৃতি প্রবচনটি সংস্কৃত ভাষাজাত। হিন্দু ধর্মালম্বীরা সংস্কৃত ভাষাকে দেব ভাষা বলে জানেন। ভাষা সংস্কৃতির বাহন। হিন্দু ধর্মের সংস্কারগুলুকে মার্জিতরুপে বহন করে বিধায় সংস্কৃত ভাষা এবং সংস্কৃতি অবিভাজ্য প্রবচন। সুতরাং সংস্কৃতি হলো হিন্দু ধর্মীয় প্রবচন। একারনে মার্জিত ধোব-দুরস্থ ধুতি পাঞ্জাবী পড়া লোককে আমরা বাবু বলি।

আর তমুদ্দুন শব্দটি হলো আরবী শব্দ। “মেদেনিয়াত” -নগর (Urbanity) শব্দ থেকে তমুদ্দুন-নগরায়ন (Urbanization) শব্দের উত্পত্তি হয়েছে। নগর সভ্যতার বিকাশের সাথে ইসলামী তমুদ্দুন প্রবচনটি ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। এক সময় হিন্দুস্থানে পায়জামা-পাঞ্জাবী, আচকান-টুপী পড়া মুসলমানের ইমেজ নগরকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এদেরকে আমরা শরীফ লোক বলে জানি। লক্ষনৌ শহরের শরীফ মুসলমানের ভদ্রতা ও সৌজন্যতা বোধের কাহিনী সারা হিন্দুস্থানে সুবিদিত।

এর বিপরীতে বৃটিশ আমলে অখন্ড বাংলার কোলকাতায় দু’ধরনের প্রবচনঃ সাহেবী কালচার ও বাবু সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। এ দু’ প্রবচন ক্ষমতার অধিকারীত্বের কারনে এতই প্রবল ছিল যে, সে সময় মুসলমানদের জনসংখ্যা ৬৭% (১৮৮১) থাকা স্বত্বেও তমুদ্দুন প্রবচনটি আইডেন্টিটি নির্মানে ব্যবহৃত হতে পারেনি। বাংগালি মুসলমানকে এ দু’ প্রবচনপন্থীরা অচ্যুতের কাতারে নিয়ে সামিল করে ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পুর্ব বাংলার মুসলমানরা স্বকীয়তার সন্ধান নামলেন। ১৯৪৮ সালেই ঢাকায় তমুদ্দুন মজলিশ নামে একটি সংগঠন গড়ে উঠলো। এ সংগঠনের নেতৃত্বে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

এ প্রেক্ষাপটে আজিকার বাংলাদেশে কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও তমুদ্দুন প্রবচন তিনটির নব মূল্যায়ন প্রয়োজন।