বিজয়ের সেই দিন
শাহ মোস্তাইন বিল্লাহ, শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০১২


মহান বিজয় দিবস। জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য দিন। দীর্ঘ ২৪ বছরের পাকিস্তানী নয়া ঔপনিবেশিক শাসন-ত্রাসনের অবসান হয়েছিলো এই দিন। এই দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে অর্জিত হয়েছিলো ন্যায়ের বিজয়। এই বিজয় ছিলো বর্বরতার বিরুদ্ধে সভ্যতার বিজয়। এই বিজয় পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার বিজয়। এই বিজয় সাম্প্রদায়িক কুটচক্রের বিরুদ্ধে মানবতার বিজয়। এই বিজয় আমাদের স্বকীয় জাতিসত্তাকে শৌর্য-বীর্যের গৌরবে উদ্ভাসিত করার বিজয়।

বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে হঠাৎ করে আসে নি। বিজয় অর্জনের জন্য ধাপে ধাপে আমাদেরকে সুদীর্ঘ সংগ্রামের পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। এই পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিলো না। এই পথে রক্ত ঝরেছে অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষের। রক্তের পিচ্ছিল পথ বেয়েই আমরা উপনীত হয়েছিলাম বিজয়ের গৌরবদীপ্ত একাত্তরের ডিসেম্বর মাসে। এই বিজয় আমাদের স্বজন হারানোর বেদনাকেও ভুলিয়ে দিয়েছিলো।

একটি জনগোষ্ঠী কখনোই তার আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না যদি তার মাঝে স্বজাতিপ্রেম ও আত্মত্যাগের মানসিকতা গড়ে না উঠে। ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে নেতাজী সুভাষ বোস জনগণের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদেরকে স্বাধীনতা দেবো”। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু মুজিব বলেছিলেন, “আমরা যখন রক্ত দিতে শিখেছি তখন কেউ আমাদেরকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না”। একাত্তরে বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে এই কথাটি অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে।

তবে বিজয় অর্জনই যথেষ্ট নয়; বিজয়কে সংহত করার কাজটি আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই বিষয়টি আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে চলেছি। দেশকে স্বাধীন করার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত এমন মানুষের অভাব হয় নি; তবে দেশকে সঠিক পথে গড়ে তোলার জন্য যে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও ত্যাগী মানুষের প্রয়োজন ছিলো তার অভাব কখনো পূরণ হয় নি। যুদ্ধবিদ্ধস্ত সদ্যস্বাধীন দেশটির সামনে ছিলো সীমাহীন চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন ছিলো যুদ্ধকালীন সময়ের মতো সর্বোচ্চ দেশপ্রেম ও জাতীয় ঐক্যচেতনা। দুঃখের বিষয়, বিজয় অর্জনের পর এর কোনোটিই অটুট থাকে নি। ফলে অল্পদিনের মধ্যেই দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা স্বাধীনতার মধ্যদিয়ে গড়ে উঠা জাতির মৌলিক চেতনায় আঘাত হানার সুযোগ পায় এবং স্বাধীনতাবিরোধী প্রেতাত্মারা ক্রমশ স্বাধীন দেশের কর্ণধার হয়ে উঠে। দেশকে তারা পুনরায় প্রাক-স্বাধীনতা আমলের ভাবধারায় নিয়ে যাওয়ার অপপ্রয়াস পায়। স্বাধীন দেশের মানুষ সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী শাসনের নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ে বছরের পর বছর। সময়ের এই অধ্যায়টিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও মহান স্বাধীনতার মধ্যদিয়ে গড়ে উঠা দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়। দেশকে ভালোবেসে এক সময় যে তরুণ ও যুবসমাজ সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের ব্রত নিয়েছিলো তাদেরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ভোগবাদী রাজনীতির শিক্ষা দেয়া হয়। দেশপ্রেমে উদ্দীপ্ত হতে পারে এমন ধরনের নবপ্রজন্ম সৃষ্টির পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা এবং স্বাধীন জাতির অগ্রগতির ধারা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় এই রাজনৈতিক অপপ্রক্রিয়াটির জন্য। এই ধারার রাজনীতির ভয়াবহ কুফল আমরা অতীতে যেমন দেখেছি; এখনো আতংকের সাথে তার জের আমরা প্রত্যক্ষ করে চলেছি।

দীর্ঘ দেড় দশক ধরে সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী শাসনের নিগড়ে আটকা পড়া দেশটিতে গণতন্ত্রের চর্চা হয় নি। কেনা-বেচার অসৎ রাজনীতির তোড়ে জননেতৃত্ব পঙ্কিলতায় আক্রান্ত হয়েছে। এই সময়কালে রাষ্ট্রযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নীতিহীনতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে। একই সাথে স্বাধীনতাবিরোধীদের শুধু পুনর্বাসন নয়; জাতীয় সংবিধানের মৌলিক চরিত্রেরও পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে।

নব্বই সনের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে যে নতুন সময়কালের সুচনা হয়েছে এই সময়কালটিকে গণতন্ত্রের আমল, নির্বাচিত সরকারের যুগ কিম্বা এই ধরনের যে কোনো পরিভাষা দিয়েই নামাঙ্কিত করা হোক না কেন; একথা সত্যি যে এই সময়কালে জনগণের মাঝে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে এবং জাতীয় ঐক্যচেতনা পুনরুত্থানে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছেন। জাতীয় ঐক্য আজ নানা দিকে বিভক্ত। রাষ্ট্র ও সমাজের এমন কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নেই যেখানে এই বিভক্তির ধাক্কা লাগে নি। রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান নেমে গেছে নিম্নতম পর্যায়ে। দুর্নীতি সর্বগ্রাসী। নীতিহীনতা সর্ব্ব্যাপী। কালো টাকার মাফিয়া সিণ্ডিকেটগুলি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্রমেই গ্রাস করে চলেছে। কোথাও কাউকে নিজ অপকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হয় না। আইনের শাসন পদে পদে বাধাগ্রস্থ। কারন অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনের প্রয়োগ করা হয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থে আইনের বিরোধিতা করা হয়। এই অবস্থান থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। সুশাসনের জন্য চাই দলীয় এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সর্বস্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সুশাসনের জন্য চাই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুশীলন। এই অনুশীলন থাকতে হবে রাজনৈতিক দলপরিচালন পদ্ধতি ও নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ায়; এই অনুশীলন থাকতে হবে রাষ্টপরিচালন প্রক্রিয়ায়। এবং এর মাধ্যমেই কেবল আমরা বিজয়ের স্বাদ অনুভব করতে পারি। যাদের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের বার্তা নিয়ে এসেছে তাদেরকে শ্রদ্ধা জানাই।