বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাক প্রশাসকের হস্তাপর্ণের আওয়ামী লীগের নিন্দা জ্ঞাপন
এইদেশ, সোমবার, জানুয়ারি ২০, ২০১৪


বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাক প্রশাসকের হস্তাপর্ণের আওয়ামী লীগের নিন্দা জ্ঞাপন
সম্প্রতি ৬ জানুয়ারি সোমবার দুপুর ১২টায় কানাডার অটোয়ায় নিযুক্ত পাকিস্তানি দূতালয়ের অভিমুখীন এক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কানাডা আওয়ামী লীগ, কুইবেক আওয়ামী লীগ, অটোয়া আওয়ামী লীগ, কানাডা মহিলা আওয়ামী লীগ ও বিসিএসসিসি অটোয়া শাখা আয়োজিত উক্ত বিক্ষোভ সমাবেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকসহ স্বাধীনতার স্বপক্ষের বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গরা অংশগ্রহণ করেন।
দুপুর ১২টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির নানা সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শনের মাধ্যমে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বর্তমানকাল পর্যন্ত পাক প্রশাসন ও তাদের দোসর বাংলাদেশে অবস্থানরত রাজাকারদের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ও প্রাত্যহিক অশুভ কার্যকলাপসমূহের তীব্র সমালোচনা করে বক্তব্য দেন এবং বিক্ষোভ সমাবেশ সমাপ্তের পূর্বে পাক প্রশাসনের প্রতি একটি স্মারকলিপি পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতের নিকট হস্তান্তর করেন।
স্মারকলিপিতে নেতারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। কাজেই তাদের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের হস্তক্ষেপ আমরা কখনো প্রশংসা করি না এবং তা অতীব নিন্দনীয়। নৃশংস হত্যাকারী, র‌্যাপিস্ট এবং যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার (মিরপুরের বুচার, ঢাকা)-এর ফাঁসীর রায়ের কার্যকর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে পাকিস্তান সংসদের নিন্দা প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার সিদ্ধান্তের কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। পাকিস্তানের এ হেন সিদ্ধান্তের আপত্তি জ্ঞান করে স্মারকপত্রে নেতারা আরো উল্লেখ করেন, ১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষ খুন করেছে এবং ২ লাখ নারীর সম্ভ্রম নাশ করেছে এবং গণহত্যা, নিপীড়ণ মনুষ্যত্বহীন অশুচি, কার্য সংঘটিত করেছেন কিন্তু স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পরও তারা বাঙালির প্রতি ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। একাত্তরের মনুষ্যত্বহীন কুকর্মের জন্য বাংলাদেশের মানুষের প্রতি অবিলম্বে সরকারিভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।
বাংলাদেশে বর্তমানে জামায়াত-শিবিরের উল্লেখনীয় রাজনীতির বিবরণ দিয়ে স্মারকপত্রে নেতারা উল্লেখ করেন যে, জামায়াত ইসলাম সম্প্রদায় ইসলাম ধর্মের পবিত্র নাম রাজনীতিতে ব্যবহার করে সকল প্রকার অশ্রেয়স্কর কার্যে লিপ্ত রয়েছে।
ধর্মের অজুহাতে রাজনীতির মারফতে ওরা অসংখ্য নারী-পুরুষ ও নিষ্পৃহ শিশু খুন করছে এবং ওরা নিরন্তর বৈর নির্যাতনে সংশ্লিষ্ট। ধর্মসঙ্গত বেশ ভুষা বা বিশ্বাসের প্রভুত বিরোধিতা করে ধর্ম ধ্বংসের স্বেচ্ছাচারিত করে চলছে। ওরা অসহিষ্ণু সন্ত্রাস প্রত্যার্পণ প্রভৃতি অশুভ কর্মেই বিশ্বাসী। মানুষ খুন আর ধর্ম বিরুদ্ধ আচরণ ছাড়া তাদের বৈপরিত্য কোনো ধরনের প্রয়াস নেই। এ ধরনের মৌলবাদী সংগঠনকে পাক সরকার, সরকারি পরিচালিত করে যাচ্ছে এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের প্রকৃত ভৃত্য পাকিস্তান সরকার। একাত্তরের বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের পর থেকে পাকিস্তানি সরকার বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নানা রক্ষণাবেক্ষণ ও পোষণ করে যাচ্ছে এবং পাক সরকারের এ সব সুযোগ-সুবিধা মৌলবাদীরা পরিভোগ করে ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশে অসামঞ্জস্য দুর্নীতি ও অসহিষ্ণু সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। মৌলবাদী সংগঠনের এহেন অমূলক নিষ্পেষণ কর্মকাণ্ডে পাক প্রশাসনের সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য স্মারকলিপিতে নেতারা হুঁশিয়ার করে দেন।
বিক্ষোভ সমাবেশে কুইবেক আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মতিন মিঞা উনার বক্তব্যে বলেন, মৌলবাদী সংগঠন কেবল বাংলাদেশেই নয়, সমগ্্র বিশ্ববাসীর জন্য বিষম অমঙ্গলজনক।
সাবেক ছাত্রনেতা কানাডা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দিদার মাহমুদ ভুঁঞা বলেন, মৌলবাদী সংগঠন শীঘ্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করা উচিত নতুবা জঙ্গীবাদ ও হত্যাযজ্ঞ বন্ধ হবে না।
কানাডা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম চেঙ্গিস বলেন, জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক বৈধ গুপ্ত মতলব হচ্ছে তান্ত্রিক পন্থার মাধ্যমে সমাসবন্ধ নিয়ন্ত্রণ করা যা চূড়ান্তভাবে জঙ্গীবাদের অনুকরণীয় বিষয়, রীতি ও কর্ম পদ্ধতিকে অনুসরণ করে।
কানাডা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদিকা সাজেদা হোসেন বলেন, মৌলবাদী সংগঠন কোনো অবস্থাতেই ওরা গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য বা নমুনাকে বিশেষভাবে অবলম্বন বা স্বীকার করে না। ওরা ইসলাম ধর্ম ব্যবহার করে তাদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় সিদ্ধ করে। অটোয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন বলেন, একাত্তরের হিংস্র নাশকদের বিচারের রায় কার্যকর না হলে বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি ফিরে আসবে না। কাজেই শীঘ্র জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি বন্ধের জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কড়া দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
অটোয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক ওমর শের একাত্তরের ঘাতকদের চলমান ও সম্ভাব্য বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত ও দীর্ঘায়ু করার জন্য পাকিস্তান নানা ধরনের পদক্ষেপে নিন্দা জ্ঞাপন করেন। অটোয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করাকে আমরা সহজে গ্রহণ করব না।
অটোয়া বাংলা কমিউনিটি সার্ভিস সেন্টারের ডিরেক্টর সোমা সাইফুদ্দিন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী খুনীদের বিচার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে পাকিস্তানের ইমরান খানের মন্তব্যের কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করে উনার বক্তব্যে বলেন, পাকিস্তানের মৌলবাদীদের উষ্ণীকৃত আরো দ্রুত আধিক্যযুক্ত হয়ে উঠছে এবং প্রত্যেক দিন শত শত নারী-পুরুষ খুন হচ্ছে। ওরা তাদের নিজেদের দেশ সামলাতে পারছে না বরঞ্চ বাংলাদেশ নিয়ে মাথা ব্যথা। নেত্রী সোমা সাইফুদ্দিন ইমরান খানের নিজের মাথায় তেল দিতে বলেন।
কানাডা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মাসুদ সিদ্দিকী উনার বক্তব্যে পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাঙালি, মুসলমানদের আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মের পরিচয় অতীব সঙ্কটের বলে মৌলবাদীরা ভাবছেন এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে তাদের ওয়াহাবী প্রতিমূর্তির নেতারা প্রায়ই তরুণ মুসলমানদের সুরাহা করার জন্য ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় যান। এই জেহাদী নেতাদের ইসলাম একমাত্র পরিচয়। আর ইসলামের পরিচয়ে জেহাদ করে অসংখ্য নিস্পৃহ মানুষ খুন করছে। কুইবেক আওয়ামী লীগের ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হাজী আল আহমদ উনার দীর্ঘ বক্তব্যে বলেন, জামায়াতে ইসলামের নেতাকর্মীরা ইসলামের নামে জেহাদী উন্মত্ততা ও সন্ত্রাস দুর্নীতি ছাড়া আর কিছুই বুঝে না।
কুইবেক আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মুন্সী বশীর একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের রায়কে কার্যকর করতে বাধাগ্রস্ত করার অভিপ্রায়ে বিএনপি-জামায়াত বেপরোয়া হয়ে দেশের সাধারণ লঘিষ্ট সম্প্রদায়ের মন্দির, ঘরবাড়ি, দোকানপাট ধ্বংস করে নৃশংসভাবে মানুষ খুন করছে এবং নারীর বলাৎকার করে নানা ধরনের অশালীন আচরণে বেষ্টিত রয়েছে। জনাব বশীর তার বক্তব্যে বলেন, জামায়াত-বিএনপির এ ধরনের অশালীন আচরণে সমগ্র মুসলমানদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং অবিলম্বে এগুলো বন্ধ না করলে এর ফল ভাল হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি করেন। মুন্সী বশীর বলেন, বাংলাদেশের এ সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সাথে পাকিস্তান জড়িত আছে। অর্থ এবং অস্ত্রসহ পাক সরকার নানা প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জ্ঞাপনসহ এ সকল কর্মকাণ্ডের জন্য ঘৃণা প্রদর্শন করছি।
উক্ত বিক্ষোভ সমাবেশে অন্যান্য বক্তারা হচ্ছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক শরীফ ইকবাল চৌধুরী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক খ ম তানভীর ইউসুফ রনী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক কবীর চৌধুরী, অটোয়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম ফুয়াদ, সহ-সভাপতি মতিউ রহমান শিকদার, বিশিষ্ট লেখক মহশিন বখত, বিশিষ্ট সমাজসেবক মোফাশের আলী প্রমুখ। সমাবেশ শেষে পাকিস্তান সরকারের অভিমুখে রচিত স্মারকপত্রের অনুলিপি কানাডা সরকারের প্রধানমন্ত্রী স্টীফান হ্যারপরসহ বাংলাদেশ দূতালয়ের রাষ্ট্রদূতের নিকট হস্তান্তর করা হয়।